ধন্যবাদ মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়কে
লটারি নয়, মেধা বা ভর্তি পরীক্ষা হোক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মূল হাতিয়ার
শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান চালিকা শক্তি। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার উপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে মানসম্মত শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এসব বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভর্তি প্রক্রিয়ায় লটারি পদ্ধতি চালু হওয়ায় মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। তাই অনেকের মতামত হলো—সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি নয়, বরং মেধা বা ভর্তি পরীক্ষাই হওয়া উচিত প্রধান হাতিয়ার।
প্রথমত, মেধা মূল্যায়নের জন্য ভর্তি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করে, নিজেকে প্রস্তুত করে এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করে। কিন্তু লটারি পদ্ধতিতে সেই পরিশ্রমের কোনো মূল্য থাকে না। ভাগ্যের উপর নির্ভর করে ভর্তি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে যে শিক্ষার্থী সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করেছে, সে সুযোগ না-ও পেতে পারে; আবার যে শিক্ষার্থী তেমন প্রস্তুতি নেয়নি, সে সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধার যথাযথ মূল্যায়নকে বাধাগ্রস্ত করে।
দ্বিতীয়ত, ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সৃষ্টি করে। প্রতিযোগিতা মানুষের উন্নতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা করে। তারা নিয়মিত পড়াশোনা করতে আগ্রহী হয় এবং নিজেদের উন্নত করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে লটারি পদ্ধতিতে এই প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার মান বজায় রাখতে সাহায্য করে। যখন কোনো বিদ্যালয়ে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, তখন সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান স্বাভাবিকভাবেই উন্নত থাকে। কারণ সেখানে এমন শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে যারা নিজ নিজ মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে সুযোগ অর্জন করেছে। এর ফলে বিদ্যালয়ের ফলাফলও ভালো হয় এবং প্রতিষ্ঠানটির সুনাম বৃদ্ধি পায়। কিন্তু লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি হলে অনেক সময় এমন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারে যারা হয়তো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বা দক্ষতা অর্জন করেনি।
চতুর্থত, ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়, তখন তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। সে মনে করে যে নিজের যোগ্যতার মাধ্যমেই সে এই সুযোগ পেয়েছে। এই আত্মবিশ্বাস ভবিষ্যৎ জীবনে তাকে আরও বড় সাফল্য অর্জনে সহায়তা করে। কিন্তু লটারি পদ্ধতিতে সুযোগ পেলে সেই আত্মতৃপ্তি বা আত্মবিশ্বাস অনেক সময় তৈরি হয় না।
পঞ্চমত, লটারি পদ্ধতিতে অনেক সময় যোগ্য শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়। দেশে এমন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে যারা কঠোর পরিশ্রম করেও সরকারি ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় না, কারণ লটারি পদ্ধতিতে তাদের নাম ওঠে না। এটি তাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
তবে লটারি পদ্ধতির পক্ষে কিছু যুক্তিও রয়েছে। অনেকের মতে, ভর্তি পরীক্ষা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং কোচিং নির্ভরতা বাড়ায়। কিন্তু এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে। যেমন—সহজ ও মানসম্মত প্রশ্নপত্র তৈরি করা, কোচিং নির্ভরতা কমানো এবং পরীক্ষার পদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করা। তাহলে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাই করা সম্ভব হবে।
এছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার করে ভর্তি পরীক্ষাকে আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করা যেতে পারে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরি, পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং মূল্যায়ন করলে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ কমে যাবে। এতে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আস্থা তৈরি হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মেধার ভিত্তিতে ভর্তি হলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে বড় বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুত হতে পারে। কারণ তারা ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতার পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এটি তাদের মানসিক দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় বাড়াতে সাহায্য করে।
সর্বোপরি বলা যায়, শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মেধা, পরিশ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন। লটারি পদ্ধতি সাময়িকভাবে সহজ মনে হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের মনোবলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি নয়, বরং মেধা বা ভর্তি পরীক্ষাকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, একটি উন্নত ও দক্ষ জাতি গঠনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় মেধার মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিকাশের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। তাই এসব বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির পরিবর্তে মেধাভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষাই হওয়া উচিত সবচেয়ে কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতি। এতে শিক্ষার্থীরা তাদের যোগ্যতার যথাযথ স্বীকৃতি পাবে এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে।
মো: মাসুদুর রহমান
সহকারী শিক্ষক ( ইংরেজি)
মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁদপুর।