ইসলামের ইতিহাসে বহু আলেম, সাধক ও মনীষী তাঁদের জ্ঞান, আমল, চরিত্র ও দাওয়াতের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে আলোকিত করেছেন। তাঁদের জীবন ও কর্ম স্মরণ মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতির চেতনা জাগাতে পারে। উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে এমনই একটি বহুল পরিচিত ধর্মীয় ঐতিহ্য ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম। প্রতিবছর হিজরি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে এটি পালন করা হয় এবং এর সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে বিশিষ্ট আলেম ও সুফিসাধক হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর স্মৃতি। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১১ রবিউস সানি, ২৩ সেপ্টেম্বর বুধবার, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালিত হবে।
‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ ‘এগারো’। রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে স্মরণানুষ্ঠানটি হওয়ায় এর নাম হয়েছে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম। প্রচলিত ঐতিহ্য অনুযায়ী, দিনটি হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি ৫৬১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন এবং কাদেরিয়া সুফি ধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁর ইন্তেকালের সঠিক তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে মতভেদ আছে। কোনো কোনো বর্ণনায় ১০ রবিউস সানি এবং প্রচলিত কাদেরিয়া ঐতিহ্যে ১১ রবিউসানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ১১ রবিউসানিকে তাঁর ওফাতের নিরঙ্কুশ ঐতিহাসিক তারিখ হিসেবে উপস্থাপনে সতর্কতা প্রয়োজন।
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) জ্ঞান, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর শিক্ষা ও উপদেশে কোরআন-সুন্নাহ অনুসরণ, আল্লাহভীতি, সত্যবাদিতা, বিনয়, তওবা, মানুষের হক আদায় এবং আত্মসংযমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্মরণ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে জীবন থেকে নৈতিক শিক্ষা নেওয়ার উপলক্ষ হওয়া উচিত।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে সাধারণত কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, দোয়া-মোনাজাত, নফল ইবাদত, দান-সদকা ও ইসালে সওয়াবের আয়োজন করা হয়। মৃত মুসলমানদের জন্য দোয়া ইসলামে স্বীকৃত আমল। তবে কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানো নিয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারী মুসলমানকে হেয় করা উচিত নয়।
এই উপলক্ষে কোরআন তিলাওয়াত, নিজের ও মৃত মুসলমানদের জন্য মাগফিরাত কামনা এবং উম্মাহর কল্যাণে দোয়া করা যেতে পারে। দরিদ্র, অসহায়, এতিম ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। স্মরণানুষ্ঠানটি মানুষের ক্ষুধা নিবারণ, অসুস্থের চিকিৎসা কিংবা অসহায়দের সহায়তায় রূপ নিলে তা মানবিকতার প্রকাশ হতে পারে।
এ ছাড়া হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন, জ্ঞানচর্চা, নৈতিক শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা নতুন প্রজন্মকে চরিত্রগঠনের শিক্ষা দিতে পারে। নিজের ভুল উপলব্ধি করে অন্যায়, অহংকার, হিংসা, মিথ্যা, প্রতারণা, সুদ-ঘুষ, মানুষের হক নষ্ট করা ও অন্যান্য গুনাহ থেকে ফিরে আসার সংকল্পও এ দিনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। একদল আলেম কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, সদকা ও ইসালে সওয়াবকে বৈধ মনে করেন এবং পুণ্যবান ব্যক্তিদের স্মরণকে নেক কাজের অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে কিছু আলেম প্রতিবছর নির্দিষ্ট একটি দিনকে বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্ধারণে আপত্তি করেন। তাই এটিকে ইসলামের ফরজ, ওয়াজিব বা সর্বসম্মত সুন্নত হিসেবে দাবি করা যথাযথ নয়। একইভাবে এ উপলক্ষে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, সদকা বা আলেমদের আলোচনা নিয়ে পারস্পরিক বিদ্বেষও কাম্য নয়। মতভেদ জ্ঞান, শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করা উচিত।
ধর্মীয় আয়োজনের মূল্য বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়, মানুষের অন্তরে তার পরিবর্তনে। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমকে যদি শুধু খাবার, আলোকসজ্জা বা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে এর আত্মিক শিক্ষার বড় অংশ হারিয়ে যেতে পারে। কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা, দোয়া, অসহায়দের সাহায্য, তওবা ও নৈতিক জীবন গঠনের সংকল্পের মাধ্যমে দিনটি আত্মশুদ্ধির অর্থবহ উপলক্ষ হতে পারে।
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর স্মরণ তখনই সার্থক হবে, যখন তাঁর জীবন থেকে সত্যবাদিতা, তাকওয়া, বিনয়, আত্মসংযম, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা গ্রহণ করা হবে। কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, দান-সদকা, আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের মতো ইসলামী মূল্যবোধের দিকে ফিরে যাওয়াই হওয়া উচিত এ আয়োজনের মূল অনুপ্রেরণা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত