কিছু কথা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়, কিছু কথা বাতাসে মিলিয়ে যায়। তবে প্রিয়জনের শেষ বাণী এমন এক স্মৃতি, যা একবার কানে প্রবেশ করলে হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী হয়ে থাকে। মৃত্যুর সীমানা পেরিয়েও সেই বাণী সন্তানের জীবনকে নীরবে পরিচালিত করে—সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের জীবনে তাঁর বাবার শেষ কথাটি তেমনই এক অমলিন স্মৃতি।
ক্যামেরার সামনে বাবার প্রসঙ্গ উঠলে চশমা খুলে চোখ মুছছিলেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছালেও বাবার কথা বলতে গিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়াল সরে গিয়ে একজন ব্যাকুল সন্তানের অনুভূতি প্রকাশ পায়।
১৯৯২ সালে মৃত্যুর আগে তাঁর বাবা বলে গিয়েছিলেন, “তোমার ভাইবোনদের দেখে রেখো।” কথাটি ছিল সংক্ষিপ্ত পারিবারিক নির্দেশনা, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা তাঁর কাছে দায়িত্ব, স্মৃতি ও পিতার আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে সুশিক্ষিত হয়ে শিক্ষকতা বা চাকরি করে সাধারণ ও সৎ জীবনযাপন করুক। কিন্তু চাঁদপুরের হাটেরনল স্কুলের সেই ছাত্রের জীবন রাজনীতির পথে এগোয়। কারাবরণ, আত্মগোপন, মামলা ও নানা জীবনসংগ্রাম পেরিয়ে তিনি জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি হন।
সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, বাবা যে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি তা হতে পেরেছেন কি না। জবাবে তিনি দীর্ঘ ব্যাখ্যা না দিয়ে চোখে জল নিয়ে বলেন, “দেখতে পারেন।” তাঁর এই প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে সন্তানের আত্মজিজ্ঞাসা ও পিতার প্রতি গভীর আবেগই প্রকাশ পেয়েছে।
১৭ বছরের সংগ্রাম, পুলিশের তাড়া, আতঙ্কে কাটানো রাত ও কারাজীবনের কারণে শৈশবের অনেক স্মৃতি তাঁর মনে নেই বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে বাবার শেষ কথাটি সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি; বরং তা তাঁর জীবনে নৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
শৈশবে বাবা-মায়ের কঠোর শাসনের কথাও তিনি স্মরণ করেন। স্কুল শেষে সরাসরি বাড়ি ফিরতে হতো; আড্ডা বা অলস ঘোরাঘুরি ছিল না। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি তরুণদের শিক্ষা শেষ না করে অলসভাবে ঘুরে না বেড়ানোর পরামর্শ দেন।
১৯৭৮ সালে বন্যাপীড়িত চাঁদপুরে জিয়াউর রহমানের আগমন তাঁর রাজনৈতিক চেতনায় প্রভাব ফেলে। পরে কারাজীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আস্থার কথাও লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসবের বাইরে তাঁর আত্মিক আশ্রয় বাবার স্মৃতিতেই রয়ে গেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে কখনো সালাত আদায়ে অবহেলা হওয়াকে তিনি আফসোস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে বাবার কাছে ক্ষমা চাওয়ার আকুতির কথাও উঠে এসেছে। বাবা জীবিত না থাকায় সেই ক্ষমাপ্রার্থনা তাঁর কাছে দোয়া ও মুনাজাতের ভাষায় প্রকাশ পায়।
জীবিত থাকা অবস্থায় বাবা-মায়ের প্রতি যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। মৃত্যুর পর বড় আয়োজনের চেয়ে জীবিত অবস্থায় তাঁদের পাশে বসা, কুশল জিজ্ঞেস করা ও যত্ন নেওয়ার গুরুত্ব বেশি—এই উপলব্ধিই লেখাটির মূল বক্তব্য।
শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনশীল হলেও বাবার শেষ কথা তাঁর জীবনের নৈতিক দিকনির্দেশনা হয়ে আছে। মানুষ চলে গেলেও পিতার স্নেহ, ভালোবাসা ও শেষ উপদেশ সন্তানের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত