চাঁদপুর শহরের অলিগলি, মেঘনার পাড়, খেলার মাঠ ও পুকুরে কেটেছে অনির্বাণ সাহার শৈশব। চারপাশের গান, তবলা ও হাওয়াইন গিটারের সুরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁকে ধীরে ধীরে শিল্পের জগতে টেনে নেয়। গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে মঞ্চে যাত্রা শুরু করা অনির্বাণ পরে নাট্যকর্মী ও সংগীতশিল্পী হিসেবে দেশের বিভিন্ন মঞ্চে পরিচিত হয়ে ওঠেন। বর্তমানে পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি তিনি সংগীতচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনির্বাণ সাহার জন্ম চাঁদপুর সদরের জোড়পুকুর পাড় এলাকায়। তাঁর বাবা প্রয়াত কানাই লাল সাহা ও মা প্রয়াত শিবানী সাহা। চাঁদপুর খ্রিস্টিয়ান মিশন স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করে হাসান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ডি এন হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে চাঁদপুর সরকারি কলেজ ও সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের প্রথম শিক্ষক ছিলেন মা শিবানী সাহা। মায়ের গান, মামার তবলা, মাসির হাওয়াইন গিটার, বড় বোন মৌয়ের নৃত্যচর্চা এবং দিদা প্রভাবতী সাহার অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। নিয়মিত গান, নাচ ও আবৃত্তির চর্চায় দিদা এবং মাসি কল্যাণী সাহার অবদানও তিনি স্মরণ করেন।
১৯৮৯ সালে চাঁদপুর সংগীত নিকেতনের সংগীত, চিত্রাঙ্কন ও নৃত্য বিভাগে ভর্তি হন অনির্বাণ। ১৯৯০ সালে টাউন হল মঞ্চে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম পরিবেশনা করেন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত চাঁদপুরসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করেন। ১৯৯২ সালে বিজয় মেলার মঞ্চে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি অংকুর কচি-কাঁচার মেলা ও খেলাঘরের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
১৯৯৮ সালে এক বছর ‘ললিত কলা’য় সংগীত গুরু প্রয়াত শীতল ঘোষালের কাছে তালিম নেন। সংগীত নিকেতন ও সপ্তরূপা নৃত্য শিক্ষালয়ে বিভিন্ন শিক্ষকের কাছেও সংগীত ও নৃত্যের প্রশিক্ষণ নেন। শৈশবের স্মৃতিচারণ করে অনির্বাণ শিক্ষকদের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণাকে তাঁর সাংস্কৃতিক পথচলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
১৯৯৮ সালে শহীদ পাটোয়ারীর মাধ্যমে মঞ্চনাটকে অভিনয় শুরু করেন তিনি। টাউন হল মঞ্চে অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর ‘রাক্ষুসী’ নাটকে ‘পচা’ চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর নাট্যজীবনের সূচনা হয়। ২০০৩ সালে বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর সদস্য হন এবং ‘লালন নামা’, ‘গিটঠু’, ‘শাহজাহান’ ও ‘জমিদার দর্পণ’সহ বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করেন।
২০০৩ সালে মৃণাল সরকারের মাধ্যমে বিজয় মেলার মঞ্চে আধুনিক মিউজিক সিস্টেমে গান পরিবেশন করেন অনির্বাণ। পরে হারুন আল রশীদের হাত ধরে চতুরঙ্গ সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত হন। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চতুরঙ্গের শিল্পী হিসেবে বিভিন্ন মঞ্চে গান পরিবেশন করেন। চাঁদপুরে থাকাকালে শঙ্কর আচার্যীর কাছেও নিয়মিত সংগীতের তালিম নেন।
২০১০ সালের পর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় যান অনির্বাণ। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সংগীত গুরু শ্রী সঞ্জীব দের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নেন এবং ছায়ানটে নজরুল সংগীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০১২ সালে ‘আরণ্যক’-এ যুক্ত হয়ে মামুনুর রশীদের সান্নিধ্যে মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন।
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ২০১৪ সাল থেকে ব্যাংকিং সেক্টরে কর্মরত আছেন। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়মিত মঞ্চে গান পরিবেশন করছেন। স্টেজ শোর পাশাপাশি কয়েকটি বিজ্ঞাপনী জিঙ্গেলেও কণ্ঠ দিয়েছেন। বর্তমানে নিজের মৌলিক গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে আসার পরিকল্পনা করছেন।
চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে অনির্বাণের ভালোবাসার পাশাপাশি কিছু আক্ষেপও রয়েছে। তাঁর মতে, সঠিক মূল্যায়নের অভাব, স্বজনপ্রীতি বা পারিবারিক সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক সময় প্রকৃত প্রতিভা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, খাঁটি প্রতিভা শেষ পর্যন্ত নিজের আলো ছড়ায়।
বর্তমানে স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন অনির্বাণ সাহা। কর্মজীবন ও পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যেও সংগীত তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেয়েকেও তিনি সংগীতে তালিম দিচ্ছেন। চাঁদপুরে বছরে দুই-তিনবার এলেও শৈশবের স্মৃতি তাঁকে আবেগাপ্লুত করে। সংগীতকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে রেখে যতদিন গলায় সুর থাকবে, ততদিন মঞ্চে গান গেয়ে যেতে চান তিনি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত