সৌদি আরবের মদিনা আল-মুনাওয়ারা ইসলামের অন্যতম পবিত্র নগরী হওয়ার পাশাপাশি বহু প্রাচীন উপত্যকা, জলপথ ও ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্যও পরিচিত। পূর্ব মদিনার ওয়াদি আল-খানাক তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যার সঙ্গে প্রাথমিক ইসলামী যুগের জলব্যবস্থাপনা ও প্রকৌশল ইতিহাস জড়িত। স্থানীয় ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, আরবি ‘খানাক’ বা ‘খানিক’ শব্দের অর্থ সংকীর্ণ গিরিপথ বা দুই উঁচু ভূভাগের মাঝের সরু পথ; উপত্যকার কিছু অংশে এমন ভূপ্রকৃতি থাকায় এর নাম ওয়াদি আল-খানাক হয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
ওয়াদি আল-খানাক মদিনা শহরের পূর্ব দিকে অবস্থিত। সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকার একটি সরু অংশে ঐতিহাসিক মুয়াবিয়া বাঁধ নির্মিত হয়েছিল। প্রাকৃতিক সংকীর্ণ পথটি এমন হওয়ায় সেখানে বৃষ্টির পানি ও আকস্মিক বন্যার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ ছিল। এ কারণে ওয়াদি আল-খানাক শুধু একটি প্রাকৃতিক উপত্যকা নয়, প্রাচীন জলনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
সৌদিপিডিয়ার তথ্য মতে, বাঁধটি আনুমানিক ৫০ হিজরিতে নির্মিত হয়েছিল। সে সময় মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.) খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন। বাঁধ নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল বৃষ্টির পানি ও বন্যার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি ধরে রাখা এবং স্থানীয় ব্যবহারের জন্য তা সংরক্ষণ করা। মরু অঞ্চলে অনিয়মিত পানির প্রাপ্যতার কারণে কৃষি ও বসতির জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকালে বাঁধটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ মিটার, উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার এবং দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ১০ মিটার ছিল বলে সৌদিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। উপত্যকার সংকীর্ণ অংশে বাঁধ স্থাপনের ফলে প্রবাহিত পানি অপেক্ষাকৃত কম জায়গায় আটকে রাখা সম্ভব হতো।
ওয়াদি আল-খানাক একটি বৃহত্তর জলপ্রবাহ ব্যবস্থার অংশ ছিল। সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এখান থেকে প্রবাহিত পানি মদিনার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওয়াদি আল-আকুলসহ আশপাশের কয়েকটি জলপথ ও শাখায় পানি সরবরাহে ভূমিকা রাখত। বর্ষাকালে বিভিন্ন শাখা-উপত্যকা ও নিম্নভূমিতে জমা পানি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের জন্য প্রাচীনকালে বাঁধ ও জলধারণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়।
মরুপ্রধান আরব ভূখণ্ডে অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হলে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। সেই বাস্তবতায় পানি ধরে রাখা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা ছিল প্রাচীন বসতিগুলোর অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ওয়াদি আল-খানাকের বাঁধ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাচীন মুসলিম সমাজের একটি বাস্তব প্রকৌশল প্রয়াসের সাক্ষ্য বহন করে।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, উপত্যকার আশপাশে পানি জমার উপযোগী নিম্নভূমি ছিল। এসব এলাকার কিছু অংশ কৃষিকাজের উপযোগী হওয়ায় পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা স্থানীয় কৃষি ও বসতির জন্য সুবিধা তৈরি করেছিল বলে গবেষণামূলক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ের প্রবাহে প্রাকৃতিক ক্ষয়, ধস ও পরিবেশগত নানা প্রতিকূলতায় বাঁধটির মূল কাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ও ভেঙে পড়েছে। তবে অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষে এর প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্য এখনও স্পষ্ট। বাঁধটির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পাথরের শিলালিপি মদিনার একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে বলে সৌদিপিডিয়ার তথ্য জানায়।
শিলালিপিটি বাঁধটির নির্মাণকাল ও নির্মাণ-সম্পর্কিত তথ্যের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত। প্রাকৃতিক ক্ষয়, আকস্মিক বন্যা, ভূপ্রকৃতিগত পরিবর্তন ও মানবীয় কর্মকাণ্ড থেকে এ ধরনের স্থাপনা রক্ষায় সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নথিভুক্ত ও জনসমক্ষে তুলে ধরার উদ্যোগ বেড়েছে। ওয়াদি আল-খানাক ও মুয়াবিয়া বাঁধও সেই ঐতিহ্য-সচেতনতার অংশ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে উত্তর-পশ্চিম সৌদির বিশাল বেলেপাথরের ক্যানিয়ন, ১০০ মিটার উঁচু বেলেপাথরের দেয়াল বা রক ক্লাইম্বিংয়ের গন্তব্য হিসেবে এটিকে বর্ণনা করার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ওয়াদি আল-খানাকের প্রধান গুরুত্ব প্রকৃতি, পানি ব্যবস্থাপনা ও ইসলামী ইতিহাসের মিলনস্থল হিসেবে। প্রায় চৌদ্দ শতাব্দী আগে নির্মিত এই জলনিয়ন্ত্রণ স্থাপনার অবশিষ্টাংশ দেখায়, প্রাথমিক ইসলামী যুগে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও পানির প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে প্রকৌশলগত সমাধান তৈরি করা হয়েছিল।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত