সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক অঞ্চলে মরুভূমির বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্যের মাঝখানে রয়েছে এক অনন্য প্রাকৃতিক ভূখণ্ড—ওয়াদি আল-দিসাহ। সুউচ্চ পাথুরে দেয়াল, খেজুরগাছ, মিঠাপানির ঝরনা এবং প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই উপত্যকা দেশটির অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থান।
ওয়াদি আল-দিসাহ স্থানীয়ভাবে ‘ওয়াদি দামাহ’ নামেও পরিচিত। এটি তাবুক প্রদেশের আল-দিসাহ এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিস্তৃত ওয়াদি বা জলপ্রবাহ ব্যবস্থা এবং প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়্যাল রিজার্ভের ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যে অবস্থিত।
সৌদি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটি খেজুরগাছ, প্রাকৃতিক ঝরনা ও পাথুরে ভূদৃশ্যের জন্য পরিচিত। সৌদিপিডিয়ার তথ্যে মূল ওয়াদি ব্যবস্থার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৫ কিলোমিটার বলা হয়েছে। এর সঙ্গে ওয়াদি কারাকির ও ওয়াদি শাওয়াকসহ একাধিক শাখা-উপত্যকা যুক্ত রয়েছে।
পর্যটনবিষয়ক সরকারি গাইডে দর্শনার্থীদের জন্য প্রায় ১৫ কিলোমিটারের একটি ট্রেকিং অংশের উল্লেখ আছে। এটি পুরো ওয়াদির দৈর্ঘ্য নয়; বরং পরিচিত হাঁটার পথ বা উপত্যকার মনোরম অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাবুক শহর থেকে প্রধান প্রবেশপথের দূরত্ব আনুমানিক ২৬০ কিলোমিটার।
ওয়াদি আল-দিসাহর ভূপ্রকৃতিতে খাড়া পাথুরে প্রাচীর, উঁচু শিলাস্তম্ভ ও সরু গিরিখাতের মতো পথ রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এটি প্রায় ৪০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও পানির উপস্থিতির কারণে আশপাশের শুষ্ক মরুভূমির তুলনায় এখানে ভিন্ন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এ অঞ্চলের কয়েকটি ঝরনা সারা বছর প্রবহমান থাকে বলে সরকারি তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদিপিডিয়ায় আইন আল-জারকা, আল-তারিফ ও আল-নামাতিয়াহ নামের ঝরনার কথা রয়েছে। পানির উৎসগুলো উপত্যকার উদ্ভিদজগৎ ও স্থানীয় পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে।
খেজুরগাছের পাশাপাশি প্যাপিরাস, ওলিয়েন্ডার, ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ ও মেহেদির উপস্থিতির কথাও সরকারি তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সবুজ উদ্ভিদরাজি, পানির প্রবাহ ও খাড়া পাহাড়ের বৈপরীত্য উপত্যকাটির দৃশ্যপটকে বিশেষ আকর্ষণীয় করেছে।
ওয়াদি আল-দিসাহর উপত্যকা ও আশপাশে প্রাচীন বসতির চিহ্ন, সমাধি, শিলালিপি এবং পাথরে খোদাই করা নিদর্শন পাওয়া গেছে। নাবাতীয় সমাধির পাথর কেটে তৈরি অসম্পূর্ণ সম্মুখভাগও এখানে রয়েছে। নাবাতীয় ও আরবি লেখার পাশাপাশি কিছু কুফিক লিপির নিদর্শনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাচীন বসতির দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ থেকে বোঝা যায়, অতীতে এ এলাকার পরিবেশ মানুষের বসবাস ও বিভিন্ন কার্যক্রমের উপযোগী ছিল। আল-দিসাহ গ্রামের প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় আল-মুশাররাফ, আল-সুখনা ও আল-মাসকুনাহ নামে কয়েকটি বসতির অবশেষের কথা সৌদিপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে অঞ্চলটিকে নির্দিষ্ট কোনো বাণিজ্যপথের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা না করে বলা যায়, এটি প্রাচীন মানববসতি ও চলাচলের সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করে।
সৌদি পর্যটন কর্তৃপক্ষের গাইডে ওয়াদি আল-দিসাহতে ট্রেকিং, পিকনিক ও পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগের কথা বলা হয়েছে। অ্যাডভেঞ্চার গাইডে নভেম্বর থেকে মার্চ মাসকে ট্রেকিংয়ের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মরুভূমি অঞ্চলে ভ্রমণের সময় আবহাওয়া, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা ও স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ওয়াদি আল-দিসাহ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট চালুর ঘোষণা দেয়। ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, টেকসই পর্যটন উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে পর্যটনসম্পদ হিসেবে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
উপত্যকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। শিলালিপি, সমাধি ও প্রাচীন বসতির অবশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। তাই পাথরে লেখা খোদাই করা, প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু সরানো বা নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে দর্শনার্থীদের বিরত থাকা জরুরি।
প্রকৃতি, পানি ও ইতিহাস—এই তিন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে ওয়াদি আল-দিসাহ সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক গন্তব্য। খেজুরগাছ, ঝরনা, পাথুরে প্রাচীর ও প্রাচীন নিদর্শন একসঙ্গে এই উপত্যকার স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত