নিজস্ব প্রতিনিধি: ফুটবল ছিল তাঁর শৈশবের ভালোবাসা। বড় ভাইয়ের খেলা দেখে যে আগ্রহের জন্ম, সময়ের সঙ্গে তা পরিণত হয় মাঠের নেশায়। স্কুল ফুটবল থেকে ক্লাব, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয় তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন। চাঁদপুর ও ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা ইস্টার্ন ক্লাবকে এবং পেয়েছেন পুরস্কার ও সম্মাননা। জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ না পেলেও ফুটবল তাঁকে দিয়েছে পরিচিতি, সম্মান ও শৃঙ্খলার শিক্ষা। বয়স বাড়লেও মাঠ ছাড়েননি চাঁদপুরের সাবেক ফুটবলার মো. জসিম উদ্দিন পাটোয়ারী; এখনো খেলেন এবং নতুন প্রজন্মকে মাঠমুখী করার চেষ্টা করছেন।
১৯৭৪ সালের ১০ নভেম্বর চাঁদপুর সদরের আদর্শ মুসলিমপাড়ায় আমজাদ পাটোয়ারী ও আমেনা বেগমের ঘরে জন্ম জসিম পাটোয়ারীর। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। বড় ভাইয়ের ফুটবল খেলা দেখেই এ খেলায় আগ্রহ তৈরি হয়।
১৯৮৮ সালের দিকে চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন তিনি। সেখানে ২০ থেকে ৩০ জন তরুণ একসঙ্গে খেলতেন। একদিন খেলার সময় ফারুক নামে এক সিনিয়র তাঁকে ক্লাব গঠনে উৎসাহ দেন। পরে কয়েকজন মিলে সেভেন স্টার নামে ক্লাব গড়েন, যার নাম পরবর্তীতে হয় ব্রাদার্স ইউনিয়ন।
গনি মডেল হাই স্কুলে পড়ার সময়ই ফুটবলে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটে। আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে দল সারা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতায় রানার্সআপ হয়। পরে চাঁদপুর সরকারি কলেজের হয়েও বিভিন্ন কলেজ টুর্নামেন্টে খেলেন। তাঁর পজিশন ছিল রাইট ব্যাক।
চাঁদপুর মোহামেডান ক্লাব, চট্টগ্রামের ছত্রদল ক্লাব ও ঢাকার ইস্টার্ন ক্লাবসহ বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন জসিম। ঢাকা ইস্টার্ন ক্লাবের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে দল চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ক্লাব থেকে তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পান। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও খেলেছেন তিনি; কুমিল্লা, সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা কাপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তবে জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ না পাওয়াকে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অপূর্ণতা হিসেবে দেখেন।
১৯৯০ সালের দিকে বিকেএসপির অনূর্ধ্ব-১৪ দল ডেনমার্কের ডানা কাপ ও সুইডেনের গোথিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরার পর মানিকগঞ্জে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। তখন সেই দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পান জসিম। এক মাস সাত দিনের প্রশিক্ষণে বিকেএসপিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর স্মৃতিতে রয়েছে।
চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফেরা শক্তিশালী দলটির বিপক্ষে ম্যাচে বিকেএসপি প্রথমে মূল দল নিয়ে মাঠে নামে। পরে বি-টিমের খেলোয়াড়দেরও নামানো হয়। শেষ পর্যন্ত একটি অফসাইড গোলের মাধ্যমে তারা জয় পায়। হারলেও ওই দলের বিপক্ষে খেলার স্মৃতি জসিমের কাছে বিশেষ হয়ে আছে।
ফুটবল জীবনের সতীর্থ ও সহযোগীদের মধ্যে কোচ ফারুক, মফিজ, জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী, হারুনুর রশিদ, আফজাল, গোলরক্ষক আমিন, মোস্তফা ও আলমগীরের কথা স্মরণ করেন তিনি। পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের উৎসাহও তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানান।
জসিম পাটোয়ারীর কাছে ফুটবল শুধু খেলা নয়, জীবন গড়ার মাধ্যমও। মাঠ থেকে তিনি কোচকে সম্মান করা, নিয়ম মেনে চলা, সময়ের মূল্য দেওয়া, পরিশ্রম করা এবং প্রতিকূলতায় নিজেকে ধরে রাখার শিক্ষা পেয়েছেন। তাঁর মতে, একজন খেলোয়াড়ের এগিয়ে যেতে শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক পরামর্শ অনুসরণ জরুরি।
পেশাগত জীবনে তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ব্যক্তিগত জীবনে দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। বর্তমানে চাঁদপুরের সোনালী অতীত ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ৪০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সী খেলোয়াড়দের নিয়ে আয়োজিত খেলায় এখনো মাঠে নামেন এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় খেলায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন।
বর্তমান প্রজন্মের খেলাধুলাবিমুখতা নিয়ে উদ্বিগ্ন জসিম। তাঁর দাবি, মাঠে নিয়মিত খেলার সুযোগ না থাকায় অনেক কিশোর-কিশোরী মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, খেলাধুলার সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত রাখা গেলে এসব সামাজিক সমস্যা কমানো সম্ভব।
মোবাইল ফোন ও আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার শিশু-কিশোরদের মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি। নিয়মিত অনুশীলন, ঘুম ও বিশ্রামের অভাবে তাদের ফিটনেসও ভালো থাকছে না। তাই মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে কিশোর-কিশোরীদের মাঠে ফেরানোর পরামর্শ দেন তিনি।
জসিমের মতে, নিয়মিত লীগ ও আন্তঃটুর্নামেন্ট না হওয়া, ক্লাবগুলো সক্রিয় না থাকা এবং আন্তঃস্কুল ও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতা নিয়মিত না হওয়ায় নতুন খেলোয়াড় তৈরি হচ্ছে না। বিভাগীয় পর্যায়েও নিয়মিত খেলার সুযোগ না থাকায় চাঁদপুরের ফুটবল পিছিয়ে পড়ছে।
স্কুল পর্যায় থেকে ফুটবলকে গুরুত্ব দেওয়া, নিয়মিত আন্তঃস্কুল ও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতা আয়োজন, ক্লাব সক্রিয় করা এবং থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে খেলা চালুর পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, গ্রাম পর্যায়ে নিয়মিত খেলা হলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসবে। প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের জাতীয় পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব।
জসিম জানান, তাঁর ছোট ভাই জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন এবং ঢাকা মোহামেডান ও ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো ক্লাবেও খেলেছেন। আগের মতো প্রতিযোগিতা ও নিয়মিত খেলা থাকলে চাঁদপুর থেকেও আবার ভালো খেলোয়াড় উঠে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
খেলাধুলার উন্নয়নে সরকারের আরও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন জসিম পাটোয়ারী। তাঁর মতে, প্রতিটি জেলায় নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজনের পাশাপাশি আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। জুতা, বুট, জার্সিসহ ক্রীড়া সামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও করা দরকার।
জসিম এখনো সোনালী অতীত ক্লাবের হয়ে মাঠে নামেন এবং নতুনদের খেলাধুলায় উৎসাহ ও পরামর্শ দেন। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলার অপূর্ণতা থাকলেও ফুটবল তাঁকে পরিচিতি, সম্মান, দায়িত্ববোধ ও অসংখ্য পুরস্কার দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত