নিজস্ব প্রতিনিধি: শুরু হয়েছে ২২ দিনের ইলিশ রক্ষা অভিযান। অভিযান সফল করতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রশাসনের লোকজন, গণমাধ্যমকর্মী-সাংবাদিক, জেলে ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে এর মধ্যেও ইলিশ ধরা থামছে না। ইলিশ সম্পদ রক্ষায় এখনই জরুরি ভিত্তিতে টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাইশ দিনের অভিযানে সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ইলিশ ধরার জাল, জেলে ও নৌকা আটক, ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড এবং নৌকা ও জাল পোড়ানোর কর্মসূচি রয়েছে। তবে বছরের পর বছর এসব কর্মসূচি চললেও ইলিশের কেজি ৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের বড় অংশের কাছে ইলিশ এখন নাগালের বাইরে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় ৫.২৯ লাখ মেট্রিক টন, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। দেশের মোট মাছ উৎপাদনে একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। তাই ইলিশ সংরক্ষণকে বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।
২০২৬ সালের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ৮ অক্টোবর শুরু হয়ে ২৯ অক্টোবর শেষ হবে। এ সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ। পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণ, ইলিশ অভয়াশ্রম পরিচালনা এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প আয়মূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তর পাঁচটি ইলিশ অভয়াশ্রম পরিচালনা করছে।
তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান দিয়ে ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়। নদী ও জলজ পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ, জেলেদের বাস্তবভিত্তিক সহায়তা, বাজার ব্যবস্থাপনা, মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণও নিশ্চিত করতে হবে। নদীতে অভিযান চললেও বাজারে ইলিশ বিক্রি হলে তা কার্যকর ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। তাই আহরণের উৎস থেকে পরিবহন, আড়ত, বাজার ও ভোক্তার পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
সংরক্ষণ কার্যক্রমে জেলেদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রকৃত জেলে পরিবার শনাক্ত করে সময়মতো খাদ্য সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ঋণ বা সুদমুক্ত অর্থায়ন, জেলেদের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা এবং নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক জালের বিরুদ্ধে নদীর পাশাপাশি উৎপাদন ও বিক্রয় পর্যায়েও ব্যবস্থা নেওয়া, জাটকা সংরক্ষণে বছরব্যাপী নজরদারি, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রের নদী-পরিবেশ রক্ষা এবং বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা, আড়তদার, পরিবহনকারী ও মজুতকারীদের নজরদারির আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
ইলিশ সংরক্ষণে জিপিএসভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, ড্রোন নজরদারি, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক অভিযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল জেলের তালিকা এবং সহায়তার ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইলিশের প্রজনন, বিচরণ, খাদ্যাভ্যাস, পানির পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ ও সমুদ্রের পরিবেশ নিয়ে নিয়মিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
ইলিশ রক্ষায় ১০ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা শতভাগ বাস্তবায়ন, প্রকৃত জেলে পরিবারের সহায়তা নিশ্চিত করা, বছরব্যাপী নদী ও বাজার নজরদারি, অবৈধ জালের উৎপাদন-বিক্রি-ব্যবহার বন্ধ, অভয়াশ্রমের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প কর্মসংস্থান, ডিজিটাল নজরদারি এবং সরকার, মৎস্য বিভাগ, জেলে, ব্যবসায়ী, গবেষক, সাংবাদিক ও ভোক্তাদের সমন্বয়ে জাতীয় ইলিশ সংরক্ষণ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।
ইলিশকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে রক্ষা করতে নিষেধাজ্ঞার সময়ের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। নদী, জেলে ও ইলিশ—এই তিনটির সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করেই টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত