নিজস্ব প্রতিনিধি: সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালিদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। অসুর বধ ও দেবী দুর্গা এই উৎসবের অন্যতম মূল প্রসঙ্গ। তবে অনিল অসুরের দাবি, মহিষাসুরসহ তাদের পূর্বপুরুষদের পরাজিত করে জমি-জঙ্গল দখলের ঘটনাকে আর্য-অনার্যদের লড়াইয়ের কাহিনী হিসেবে দেখা উচিত।
অনিল অসুর ‘অসুর’ তফসিলি উপজাতির সদস্য। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ঝাড়খণ্ডের তফসিলি উপজাতির সরকারি তালিকায় অসুর সম্প্রদায়ের নাম রয়েছে। ঝাড়খণ্ডের গুমলা জেলায় বসবাসকারী অনিল দীর্ঘদিন বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। তিনি দুবার বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থীও হয়েছিলেন।
অসুর সম্প্রদায়ের সদস্য ও নৃতত্ত্ববিদদের মতে, হিন্দু বাঙালিদের দুর্গাপূজায় মহিষাসুর বধের যে কাহিনী রয়েছে, মহিষাসুর সেই অসুর উপজাতির পূর্বপুরুষ এবং একজন শক্তিশালী আদিবাসী রাজা ছিলেন। তবে হিন্দু পুরাণ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মধ্যে এই কাহিনীকে আর্য-অনার্যদের লড়াই হিসেবে দেখার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
অসুরদের ঐতিহ্যগত পেশা ছিল পাথর গলিয়ে লোহা তৈরি করা। এই প্রাচীন পদ্ধতি তারা সম্প্রদায়ের মধ্যে গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করে আসছে। তবে অনেক অসুর বর্তমানে অন্য পেশায় যুক্ত। অনিল অসুর জানান, তার বাবা স্কুলশিক্ষক ছিলেন। দুর্গাপূজার সময় তার মা পূজা দিতে গেলে বাবা মহিষাসুরকে তাদের পূর্বপুরুষ এবং দুর্গাকে তার হত্যাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এরপর তার মা আর দুর্গাপূজা দেননি বলে জানান তিনি।
অনিলের ভাষ্য, অসুর পরিবারে মহিষাসুরের কোনো বিগ্রহ বা প্রতিকৃতি রাখা হয় না; তারা মনে মনে তাকে স্মরণ ও প্রণাম করেন। তার মতে, দুর্গাপূজার সময়ে অসুর স্মরণ বা অসুরপূজা এখন আদিবাসী সমাজের একটি সামাজিক আন্দোলনের অংশ, যার মাধ্যমে আর্য সংস্কৃতির বিপরীতে পাল্টা আখ্যান তৈরি হচ্ছে।
হিন্দু পুরাণে মহিষাসুর ও দেবী দুর্গার যুদ্ধের কাহিনী থাকলেও আদিবাসী লোকগাথায় এর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। হিন্দু পুরাণ গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপনের মতে, মহিষাসুর ছিলেন শক্তিশালী ও প্রজাবৎসল রাজা। আদিবাসী লোকগাথা অনুযায়ী, এক গৌরবর্ণা নারীকে দিয়ে তাদের রাজাকে হত্যা করা হয়েছিল।
তথ্যচিত্র নির্মাতা সুমিত চৌধুরীর ব্যাখ্যায়, দুর্গার গৌরবর্ণ, টিকলো নাক এবং মহিষাসুরের কালো গায়ের রং, কোঁকড়ানো চুল ও পুরু ঠোঁটের চিত্রায়ণ আর্য ও অনার্যদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। শরদিন্দু উদ্দীপনের মতে, মহিষাসুরকে পরাজিত করতে না পেরে আর্যরা একজন নারীকে ব্যবহার করেছিল—এমন বিশ্বাস আদিবাসী সমাজে প্রচলিত।
দলিত ও আদিবাসী দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস বিশ্লেষণকারী জ্যোতিরাও ফুলে এবং বি. আর. আম্বেদকর পুরাণ ও লোককথার আলোকে আর্য-অনার্য সংঘাতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের বিশ্লেষণে অসুর, দানব, রাক্ষস, দৈত্য, কিন্নর, নাগ ও যক্ষদের মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
হিন্দু শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ও পশ্চিমবঙ্গ বৈদিক অ্যাকাডেমির প্রধান নবকুমার ভট্টাচার্য আর্য-অনার্য সংঘাতের তত্ত্বের সঙ্গে একমত নন। তার মতে, বেদ, পুরাণ ও উপনিষদে দুর্গাপূজার কাহিনী রয়েছে। মহিষাসুর বধ পুরো অসুর সম্প্রদায়কে ধ্বংসের ঘটনা নয়; এটি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির লড়াই।
নবকুমার ভট্টাচার্য আরও বলেন, পুরাণে ভালো অসুরের উদাহরণও রয়েছে, যেমন ময়দানব। তার মতে, মহিষাসুর মৃত্যুর সময় দেবী দুর্গার কাছে আত্মসমর্পণ করে তার সঙ্গে থাকার ও পূজা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। দুর্গাপূজার কিছু আচার, যেমন নবপত্রিকার পূজা, আদিবাসী প্রকৃতিপূজার প্রভাব বহন করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গবেষকদের মতে, মহিষাসুর-সংক্রান্ত লোকগাথা প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, উত্তর ভারত থেকে দাক্ষিণাত্য, বর্তমান নেপাল ও বাংলাদেশের নানা জায়গায় এই লোকগাথার প্রচলন রয়েছে। মহিষাসুর গবেষক প্রমোদ রঞ্জনের মতে, এই অসুর সম্প্রদায়ের ইতিহাস আর্যদের আগমনের আগের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত