নিজস্ব প্রতিনিধি: আধুনিক সভ্যতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক গতির সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই জনগণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় বিদ্যুৎ খাতকে যুগোপযোগী সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে আরও কার্যকর, নির্ভরযোগ্য ও জনবান্ধব করা জরুরি।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকাতেও বিদ্যুতের সংযোগ বিস্তৃত হয়েছে এবং শিল্পকারখানা, ব্যবসা, কৃষি সেচ ও গৃহস্থালিতে এর ব্যবহার বেড়েছে। তবে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না; উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে শক্তিশালী সঞ্চালন ও আধুনিক বিতরণব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সাধারণ মানুষ, হাসপাতাল, শিক্ষার্থী, অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং কৃষি সেচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে অনিয়মিত সরবরাহ নাগরিক দুর্ভোগের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির গতিও মন্থর করতে পারে।
নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—তিন স্তরকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতা, সাবস্টেশনের সক্ষমতার ঘাটতি ও বিতরণব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পুরোনো লাইন সংস্কার, আধুনিক সাবস্টেশন স্থাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিতরণ লাইন উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য দ্রুত পাওয়া, ত্রুটি শনাক্ত করা এবং বিদ্যুৎ প্রবাহ ব্যবস্থাপনা সহজ করা সম্ভব। স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ ও দ্রুত পুনঃসংযোগ ব্যবস্থা চালু হলে দীর্ঘ সময় বড় এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঝুঁকি কমবে। শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ বিতরণব্যবস্থাকেও ধীরে ধীরে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা দরকার।
শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক এলাকা, শহর, গ্রাম ও কৃষিপ্রধান অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদার ধরন ভিন্ন। গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় অঞ্চল ও মৌসুমভিত্তিক পূর্বাভাস তৈরি করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ও তথ্য বিশ্লেষণ এ কাজে সহায়ক হতে পারে।
জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণও জরুরি। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহারে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সৌরশক্তি এবং উপযোগী এলাকায় নবায়নযোগ্য প্রকল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি এনার্জি স্টোরেজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা দরকার।
আধুনিকায়নের সঙ্গে সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজন নিরূপণ, ব্যয়-সুফল মূল্যায়ন ও বাস্তবসম্মত সময়সূচি নির্ধারণ জরুরি। অযৌক্তিক বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধে স্বচ্ছতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়ে জনস্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পুরোনো লাইন, অবৈধ সংযোগ, মিটারিংয়ের দুর্বলতা ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে সিস্টেম লস হয়। উন্নত মিটারিং, স্মার্ট প্রিপেইড মিটার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিক বিতরণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে এ ক্ষতি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কলসেন্টার, অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, মোবাইল অ্যাপ এবং নির্দিষ্ট সময়ে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের আগে গ্রাহকদের আগাম তথ্য দেওয়াও জরুরি।
শুধু বিদ্যুৎ থাকা যথেষ্ট নয়; ভোল্টেজের ওঠানামা, ঘন ঘন ট্রিপিং ও নিম্নমানের সরবরাহও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করতে পারে। তাই নিরবচ্ছিন্নতার পাশাপাশি মানসম্মত ও স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে জনগণের অংশগ্রহণও প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রযুক্তি গ্রহণ এবং পিক আওয়ারে ব্যবহার কমানোর বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগ জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে পারে।
একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে নিরবচ্ছিন্ন, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প নেই। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন, স্মার্ট গ্রিডের বিস্তার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও গ্রাহকসেবা উন্নয়নে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত