নিজস্ব প্রতিনিধি: মানবজীবনের প্রকৃত সাফল্য কেবল পার্থিব উন্নতি, ধনসম্পদ কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠায় সীমাবদ্ধ নয়; মহান আল্লাহকে চেনা, তাঁর প্রতি অবিচল বিশ্বাস রাখা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনার মধ্যেই প্রকৃত কল্যাণ। এই আত্মিক যাত্রায় আল্লাহর জিকির বা স্মরণ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। আল্লাহর জিকির ঈমানকে সজীব রাখে, আত্মাকে পাপ থেকে ফিরতে সহায়তা করে এবং স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য বাড়ায়। ইসলামের আধ্যাত্মিক সাধনায় কালিমায়ে তাইয়্যিবা—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’—বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাসাউফের পরিভাষায় এই জিকিরের দুটি দিক হলো ‘নফি’ ও ‘ইসবাত’।
‘নফি’ অর্থ অস্বীকার বা নাকচ করা, আর ‘ইসবাত’ অর্থ প্রতিষ্ঠা, স্বীকার বা সত্য হিসেবে সাব্যস্ত করা। কালিমায়ে তাইয়্যিবার ‘লা ইলাহা’ অংশে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব উপাস্যত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। কোনো সৃষ্টি, প্রতিমা, মানুষ, বস্তু বা অন্য কোনো সত্তা আল্লাহর মতো ইবাদতের অধিকারী নয়। একই সঙ্গে মানুষের প্রবৃত্তি, অন্যায় আকাঙ্ক্ষা ও অবৈধ আনুগত্যের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকার শিক্ষাও এতে রয়েছে।
‘ইল্লাল্লাহ’ অংশে একমাত্র মহান আল্লাহকে ইবাদতের প্রকৃত অধিকারী হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, তাঁর ওপর ভরসা রাখা এবং তাঁর নির্দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা তাওহিদের অপরিহার্য শিক্ষা। তাই নফি-ইসবাতকে কেবল ‘না’ ও ‘হ্যাঁ’-এর ভাষাগত কাঠামো হিসেবে দেখলে কালিমার গভীর তাৎপর্য ধরা পড়ে না; এর মূল শিক্ষা হলো মিথ্যা উপাস্যত্ব প্রত্যাখ্যান করে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বাস, ইবাদত, আনুগত্য ও জীবনাচরণে তার প্রতিফলন ঘটাতে হয়। একজন মানুষ যখন একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের ঘোষণা দেন, তখন তাঁর উচিত শিরক থেকে দূরে থাকা, অন্যায় প্রত্যাখ্যান করা, সত্য গ্রহণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য করা।
মিথ্যা পরিহার করে সত্য প্রতিষ্ঠা, অন্যায় উপার্জন বর্জন করে হালাল জীবিকা গ্রহণ, অহংকার এড়িয়ে বিনয়ী হওয়া, মানুষের অধিকার রক্ষা ও আমানত সংরক্ষণ—এসব তাওহিদে বিশ্বাসী মানুষের চরিত্রে সেই বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন।
কুরআনে মুমিনদের অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, বান্দা আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন। জিকির শুধু নির্দিষ্ট সময়ে কিছু শব্দ উচ্চারণ নয়; বরং সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সচেতন থাকা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলার সাধনা।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে আল্লাহর জিকিরের মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। জামে আত-তিরমিজিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-কে সর্বোত্তম জিকির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর শ্রেষ্ঠত্ব শুধু উচ্চারিত শব্দে নয়; অর্থ উপলব্ধি, অন্তরে বিশ্বাস এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনাই এর প্রকৃত দাবি।
তাসাউফের বিভিন্ন ধারায় নফি-ইসবাত জিকিরের জন্য বসার ভঙ্গি, শ্বাস-প্রশ্বাস, উচ্চারণ ও মনোসংযোগের বিভিন্ন অনুশীলন প্রচলিত রয়েছে। কোনো কোনো পদ্ধতিতে চোখ বন্ধ রাখা বা শরীরের নির্দিষ্ট অংশের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়। তবে আল্লাহর জিকির কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ইবাদত হলেও কোনো নির্দিষ্ট তরিকার শারীরিক ভঙ্গি বা পদ্ধতিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত বলতে নির্ভরযোগ্য শরয়ি দলিল প্রয়োজন। তাই কোনো তরিকার অনুশীলনকে সর্বজনীন ইসলামী বিধান বা জিকিরের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
জিকিরের প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু জিহ্বাকে কিছু শব্দ উচ্চারণে অভ্যস্ত করা নয়; বরং অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে সজাগ রাখা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা বাড়ানো এবং পাপ থেকে ফিরে আসার শক্তি অর্জন করা। জিকিরের সুফল তখনই জীবনে গভীরভাবে প্রকাশ পায়, যখন তা মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। প্রতারণা, জুলুম, অহংকার ও মানুষের অধিকার হরণের মতো কাজ থেকে দূরে থাকা এবং সততা, দয়া, ন্যায়পরায়ণতা ও উত্তম চরিত্র ধারণ করা এর বাস্তব শিক্ষা।
নফি-ইসবাতের শিক্ষা হলো অন্যায় প্রত্যাখ্যান করে ন্যায় গ্রহণ, অহংকার পরিহার করে বিনয় ধারণ এবং হারাম থেকে দূরে থেকে হালাল বেছে নেওয়া। এসব নৈতিক শিক্ষা কালিমার মূল আকিদাগত অর্থের বিকল্প নয়; বরং তাওহিদে বিশ্বাসের বাস্তব প্রয়োগ।
নফি-ইসবাত জিকিরের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো তাওহিদের স্বীকৃতি—মিথ্যা উপাস্যত্ব অস্বীকার করে একমাত্র মহান আল্লাহকে ইবাদতের অধিকারী হিসেবে মেনে নেওয়া। কালিমায়ে তাইয়্যিবা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি ঈমানের ঘোষণা এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এর অর্থ অন্তরে ধারণ করে, জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার মধ্যেই এর প্রকৃত শিক্ষা নিহিত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত