নিজস্ব প্রতিনিধি: রোডসের নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে লেখকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—হাজার হাজার বছর আগে এই ভূখণ্ডের কাছাকাছি মানুষ রাষ্ট্র, নাগরিক, আইন ও শাসন নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিল, সেগুলোর কতটা আমরা সত্যিই শিখেছি।
গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনায় সাধারণত নির্বাচন, ভোটাধিকার, সংসদ, রাজনৈতিক দল, সংবিধান ও আইনের শাসনের বিষয় আসে। তবে একজন নাগরিকের সত্য বলা, প্রশ্ন করা, ভিন্নমত পোষণ করা এবং রাষ্ট্রের কাছে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোর অধিকারও গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লেখকের মতে, গণতন্ত্র বোঝার ক্ষেত্রে সততা ও মর্যাদা—এই দুটি বিষয় নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। সততা ছাড়া গণতন্ত্রের ওপর আস্থা থাকে না, আর মর্যাদা ছাড়া গণতন্ত্র মানুষের জন্য অর্থবহ হয় না।
প্রাচীন গ্রিসকে গণতন্ত্রের অন্যতম জন্মভূমি হিসেবে দেখা হলেও সে সময়ের গণতন্ত্র আধুনিক গণতন্ত্রের মতো ছিল না। এথেন্সে নাগরিকেরা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশ নিতেন এবং অ্যারিস্টটল নাগরিককে এমন ব্যক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যার বিচারিক বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অধিকার আছে। তবে নারী, দাস ও বিদেশিরা পূর্ণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
এ থেকে লেখক মনে করেন, গণতন্ত্র কোনো সমাপ্ত অর্জন নয়; এটি চলমান মানবিক পরীক্ষা। ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা কীভাবে ব্যবহৃত হবে এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তি কতটা সৎ থাকবেন—এই প্রশ্নগুলো এখনও প্রাসঙ্গিক।
২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে লেফট পার্টির মোহামেদ আবদুকাদির আলী ব্যক্তিগত ভোটে রিক্সদাগে নির্বাচিত হন। তিনি ৬৪৮টি ব্যক্তিগত ভোট পেয়ে দলীয় তালিকার কয়েকজন প্রার্থীকে পেছনে ফেলেন। পরে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাকে ঘিরে সম্ভাব্য ভোট অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। সুইডিশ টেলিভিশন চ্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তে তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তখন পর্যন্ত কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়নি। আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টি শুনে হতবাক হয়েছেন বলে জানান। পরে লেফট পার্টি জানায়, তদন্ত চলাকালে তিনি সংসদীয় দায়িত্ব থেকে বিরত থাকবেন।
লেখকের বক্তব্য, অভিযোগ, সন্দেহ, তদন্ত ও অপরাধ—এগুলো এক বিষয় নয়। তাই অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও ঠিক নয়। সততা, জবাবদিহি ও আইনের প্রয়োগের সঙ্গে বিচারবোধ এবং ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষাও জরুরি।
সুইডিশ রিক্সদাগের আচরণবিধিতে সংসদ সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত, আর্থিক স্বার্থ, ঘুষ ও উপহারের বিষয়ে নৈতিক নির্দেশনা রয়েছে। সংসদ সদস্যদের আর্থিক স্বার্থ ও অঙ্গীকারের প্রকাশ্য রেজিস্টারও আছে। এর উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শনাক্তের সুযোগ তৈরি করা।
ওইসিডির ২০২৬ সালের ট্রাস্ট সার্ভে অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইডেনে জাতীয় সরকারের ওপর উচ্চ বা মাঝারি মাত্রার আস্থা ছিল ৪২ শতাংশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা ছিল ৩১ শতাংশ। একই সময়ে পুলিশ ও আদালতের ওপর আস্থা ছিল যথাক্রমে ৬৯ ও ৬৫ শতাংশ। লেখকের মতে, এ পার্থক্য রাজনীতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার মধ্যে ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে মানুষের সংগ্রাম রয়েছে। তবে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এক বিষয় নয়। বিরোধী মতের প্রতি সম্মান, ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য আইনের সমতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নাগরিক মর্যাদা এবং ক্ষমতা হারানোর পরও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অক্ষুণ্ণ রাখা—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার পরিবর্তনের পরও দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহির অভাব, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে অসন্তোষ ও উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানুষের প্রতিবাদে প্রকাশিত এসব প্রতিক্রিয়াকে পুরো জনগণের মতামতের পরিসংখ্যান না হলেও সমাজের অস্বস্তি, প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সংকেত হিসেবে দেখা হয়েছে।
লেখকের মতে, সততা শুধু মিথ্যা না বলার নাম নয়। জনস্বার্থকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ওপরে রাখা, নিজের দলের ভুল স্বীকার করা, প্রতিপক্ষের সত্য মেনে নেওয়া এবং ক্ষমতাকে প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করাও সততার অংশ। অন্যদিকে, মতের বিরোধ থাকলেও প্রত্যেক মানুষের মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা গণতন্ত্রের দায়িত্ব।
সুইডেনে আলীকে ঘিরে অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত বলে লেখায় বলা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে আইনি প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত হবে, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট সবার মর্যাদা ও অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকা উচিত।
গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষমতা পেলেও সংখ্যালঘুর মর্যাদা হারাবে না, সরকার পরিবর্তিত হলেও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলাবে না এবং ক্ষমতাবান কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না—এমন ব্যবস্থাই গণতন্ত্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত। সততা গণতন্ত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে, মর্যাদা তাকে মানবিক করে এবং জবাবদিহি দুটিকে টিকিয়ে রাখে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত