নিজস্ব প্রতিনিধি: মানুষের জীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতা পাশাপাশি চলে। কেউ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অর্জন করেন, কেউ অনেক চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন না। কেউ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তৃপ্তির হাসি হাসেন, আবার কেউ সারাজীবন অতৃপ্তি, হতাশা ও না-পাওয়ার বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকেন। কিন্তু সাফল্য ও ব্যর্থতার হিসাব করতে গিয়ে মানুষের মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারলে আমরা স্বস্তি পাই, আর সফল হলে তার কৃতিত্ব নিজের করে নিতে চাই।
চারপাশের মানুষের কথাবার্তা ও জীবন পর্যালোচনা করলে এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়। অনেকে নিজেদের অপূর্ণতার কারণ হিসেবে অভাব, শিক্ষার সুযোগের ঘাটতি, পারিবারিক অনটন, ভাগ্য, প্রভাবশালী আত্মীয়ের অনুপস্থিতি কিংবা সংসারের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেন। কেউ কেউ মনে করেন, আত্মীয়স্বজনের ঈর্ষা, মানুষের অসহযোগিতা বা প্রতিকূল পরিবেশই তাদের ব্যর্থতার প্রধান কারণ। এভাবে নিজের জীবনের অপূর্ণতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত, সীমাবদ্ধতা ও ভুলের বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
অন্যদিকে, সফল মানুষের কথাবার্তায় প্রায়ই নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম ও মেধার ওপর জোর দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তারা নিজেদের সম্পূর্ণ স্বনির্মিত বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু একজন মানুষের সাফল্যে ব্যক্তিগত মেধা, অধ্যবসায়, সাহস ও সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষার সুযোগ, আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক যোগাযোগ, সুস্থতা এবং অন্য মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতাও ভূমিকা রাখে। মা-বাবার যত্ন, শিক্ষকের অনুপ্রেরণা, বন্ধুর পরামর্শ বা বিপদের সময় কারও দেওয়া সাহস ভবিষ্যতের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সাফল্যের কৃতিত্ব নিজের পরিশ্রমকে দেওয়ায় অন্যায় নেই; অন্যায় হলো সেই সাফল্যের পেছনে থাকা মানুষের অবদান অস্বীকার করা। একইভাবে ব্যর্থতার জন্য কেবল অন্যের অসহযোগিতাকে দায়ী করাও যুক্তিসংগত নয়। প্রতিকূলতা, বৈষম্য, সুযোগের অভাব, পারিবারিক দায়িত্ব বা বিশ্বাসঘাতকতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে নিজের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি, ভুল, সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখা দরকার।
সংসারের দায়িত্বের কারণে কেউ উচ্চশিক্ষা নিতে না পারলে তার পেছনে পারিবারিক বাস্তবতার ভূমিকা থাকতে পারে। আবার ব্যবসায় ক্ষতির ক্ষেত্রে বাজারের প্রতিকূলতা বা অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি পরিকল্পনার ঘাটতি, ঝুঁকি মূল্যায়নের ভুল এবং দক্ষতার অভাবও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাই জীবনকে বুঝতে হলে একমাত্রিক ব্যাখ্যার বাইরে আসতে হবে।
সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত যোগ্যতার ফল নয়, আবার ব্যর্থতাও সব সময় ব্যক্তিগত অযোগ্যতার প্রমাণ নয়। জীবনের ফলাফল ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির পারস্পরিক প্রভাবে তৈরি হয়। কোথাও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা প্রধান ভূমিকা রাখে, কোথাও সুযোগের প্রভাব বেশি হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে একাধিক উপাদান একসঙ্গে কাজ করে।
নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করা নিজেকে ছোট করা নয়; বরং ভুল চিহ্নিত করতে পারা ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। একইভাবে সাফল্যের পেছনে অন্যের অবদান স্বীকার করলে মর্যাদা কমে না, বরং কৃতজ্ঞতা ও বিনয়ের প্রকাশ ঘটে। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝলে শেখার সুযোগ তৈরি হয়, আর অন্যের অবদানকে সম্মান করলে সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি করা যায়।
জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ভাবা দরকার—কী পেয়েছি, কী পাইনি, কেন পাইনি এবং নিজের সিদ্ধান্তের ভূমিকা কতটুকু ছিল। পাশাপাশি অগ্রযাত্রায় কারা সহযোগিতা করেছেন এবং অন্যের জীবনে নিজের অবদান কী, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। অন্যকে দোষারোপ করে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয় না। আবার সব কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করলেও বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
ব্যর্থ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, সফল মানুষের পরিশ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং উভয় ক্ষেত্রেই পারিপার্শ্বিক অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। নিজের প্রাপ্য কৃতিত্ব গ্রহণের পাশাপাশি অন্যের অবদান স্বীকার করা এবং নিজের ভুলের দায় নেওয়ার মধ্যেই পরিণত মানুষের পরিচয়। ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিংবা সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিজের করে নেওয়া—কোনোটিই পূর্ণ সত্য নয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরিফ রাসেল, প্রধান সম্পাদক: এমরান হোসেন রাজন, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ জাহিদুর ইসলাম ভূঁইয়া, বার্তা সম্পাদক: মোঃ ইসমাইল হোসেন।
অফিস: কুমিল্লা রোড় চক্ষু হাসপাতালের বিপরীত পাশে পাটওয়ারী ভবন (৩য়) তলা চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। মোবাইল: ০১৯১৪-৬১৩৫৪৪, ০২৩৩৭৭-৪২৮৭৫, ইমেল: banglaaadi@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত