
আবু মুছা আল শিহাব:
চাঁদপুরের শাহরাস্তি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাত্তলা গ্রামের বেপারী বাড়িতে সংঘটিত বহুল আলোচিত গৃহবধূ রিগান আক্তার মিমের (২৬) চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের অল্প সময়ের মধ্যেই রহস্য উদ্ঘাটন করেছে শাহরাস্তি মডেল থানা পুলিশ। ১৬৪ ধারায় আদালতে দোষ স্বীকারোক্তি
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন নিহতের ছোট জা। ঘটনার পর ‘ডাকাতির’ গল্প সাজিয়ে তদন্ত ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও নিবিড় তদন্ত, আলামত বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ছোট জা কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনা (২৩) হত্যার দায় স্বীকার করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব থেকে আপন বড় জা রিগান আক্তার মিমকে গলাটিপে হত্যা করেন সুমাইয়া। পরে ঘটনাটিকে ডাকাতির সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে নিজেকেও আহত দেখানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশের কাছে মুখোশধারী দুই দুর্বৃত্তের একটি বর্ণনা দেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহত রিগান আক্তার মিম ওই গ্রামের মৃত সেলিম বেপারীর পুত্রবধূ। তিনি আড়াই বছর বয়সী এক কন্যা ও চার মাস বয়সী এক পুত্রসন্তানের জননী। ঘটনার সময় তার স্বামী কর্মস্থলের কারণে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।
ঘটনার পর আহত দাবি করা সুমাইয়া আক্তার পুলিশকে জানান, গভীর রাতে মুখ বাঁধা দুই ব্যক্তি ঘরে ঢুকে তাকে ও তার শিশুকে জিম্মি করে স্বর্ণালংকার লুট করে এবং হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করার পর পাশের কক্ষে গিয়ে বড় জায়ের ওপর হামলা চালায়। তবে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তার বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়ে।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক তথ্য বিশ্লেষণ করে। তদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হলে সুমাইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার (১৬ জুলাই) আসামি কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনা বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দিতে তিনি প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে বড় জাকে গলাটিপে হত্যার কথা স্বীকার করেন
বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে চাঁদপুরের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে জানাজা সম্পন্ন করে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নিহতের বাবা বাদী হয়ে শাহরাস্তি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে শাহরাস্তি মডেল থানা পুলিশের পাশাপাশি একাধিক টিম কাজ করে। তদন্তের খুব কম সময়ের মধ্যেই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হওয়ায় পুলিশের তৎপরতা প্রশংসিত হয়েছে।
শাহরাস্তি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান জানান, তদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হলে সুমাইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
আসামি কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনা বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে বড় জাকে গলাটিপে হত্যার কথা স্বীকার করেছে মিনা।
ঘটনা’র দিন রাতে একই টেবিলে বসে একসাথে খাবার খায় তারা। সাংসারিক ছোট খাটো ব্যাপার বাক বিতণ্ডায় একপর্যায়ে দুই জায়ের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এসব কথা পরিবারের কাউকে না বলার শর্তে দুজনের আবার মিল হয়ে গেলে তারা নিজ নিজ কক্ষে ঘুমাতে চলে যায়।
পরবর্তীতে গভীর রাতে মিম মিনার কক্ষে প্রবেশ করে ঘুমন্ত মিনাকে আঘাত করে। এতে মিনা ক্ষিপ্ত হয়ে মিমের উপর হামলা করে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মিম মাটিতে পড়ে গেলে মিনা মিমের উপর বসে গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে গলা চেপে না ধরলেও মরে যাওয়ায় পরবর্তীতে ডাকাতির নাটক সাজায়। মামলার তদন্তের পরবর্তী ধাপ, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।