
নিজস্ব প্রতিনিধি: অনেক দিন আগের কথা। একটি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ছিলেন নিরক্ষর ও অত্যন্ত দরিদ্র। শিক্ষার অভাবে জীবনমান ছিল নিম্ন, কাজের সুযোগও ছিল সীমিত। দুই-চারজন সচ্ছল কৃষক ছাড়া প্রায় সবাই দিনমজুর ছিলেন; কিছু মানুষ ভিক্ষাও করতেন। বছরের বড় সময় কাজ না থাকায় দরিদ্র মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠত। ক্ষুধার তাড়নায় কেউ কেউ আত্মহত্যা বা চুরির মতো কঠিন পথের একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হতেন।
একসময় চোরদের অত্যাচারে গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। চোর ধরা পড়লে সালিশ বসত, কখনো শাস্তি দেওয়া হতো, আবার চুরি করা মাল ফেরত দিলে শাস্তি মওকুফও করা হতো। পাহারা বসিয়েও চুরি বন্ধ করা যায়নি।
সেই গ্রামে ছিলেন একজন মাস্টার মশাই। তিনি পাশের একটি থানার হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। গ্রামের কয়েকজন সচেতন যুবক তাঁর কাছে গিয়ে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পরামর্শ চান। মাস্টার মশাই আগে থেকেই গ্রামের অবস্থা জানতেন; চোরদের সালিশেও তিনি কখনো কখনো উপস্থিত থাকতেন।
তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, এসব চোর ক্ষুধার তাড়নায় চুরি করলেও তাদের আত্মমর্যাদা ছিল। কয়েকজন কর্মসংস্থানের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গিয়েছিলেন।
যুবকদের মাস্টার মশাই বলেন, বিচার ও শাস্তি দিয়ে চুরি বন্ধ করা যাবে না; এর জন্য গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তাঁর মতে, শিক্ষা মানুষের মর্যাদাবোধ বাড়াবে এবং চুরি ছাড়ার পথ তৈরি করবে।
তাঁর পরামর্শে যুবকদের উদ্যোগে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কিছু ব্যক্তি, যারা চোরদের চুরি করা জিনিস নিজেদের জিম্মায় রাখতেন বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কয়েক বছরের মধ্যে গ্রামে চুরি কমে আসে এবং একসময় বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার বছর বিদ্যালয়টি হাই স্কুলে উন্নীত হয়। ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছায়, বাড়তে থাকে উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা। খেলাধুলা, নাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক সংগঠনও গড়ে ওঠে।
বিদ্যালয়টি এখনো রয়েছে এবং আশপাশের গ্রামেও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করছে। তবে লেখকের মনে হচ্ছে, গ্রামে চোর-ডাকাতের সংখ্যাও বেড়েছে। আগের দিনের ক্ষুধার্ত চোরদের সঙ্গে বর্তমান সময়ের চোর-ডাকাতদের পার্থক্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর আক্ষেপ, এখন সেই মাস্টার মশাইয়ের উপদেশ কেউ শোনে না; সমাজেও তাঁর গুরুত্ব নেই।