
নিজস্ব প্রতিনিধি: কিছু বিদায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিছু মানুষের চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারকে শোকাহত করে না, কর্মস্থলেও তৈরি করে গভীর শূন্যতা। গতকালও যে সহকর্মীর সঙ্গে কথা হয়েছে, কাজের ফাঁকে হয়েছে খুনসুটি, মতের অমিল কিংবা সামান্য অভিমান—পরদিন সেই মানুষটির আর পৃথিবীতে না থাকার খবর বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। দরজা খোলে, মানুষ আসে, কাজ শুরু হয়; শুধু সেই মানুষটি আর ফিরে আসেন না।
দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের কর্মী, চাঁদপুর শহর প্রতিনিধি ও কম্পিউটার অপারেটর মো. মোস্তফা কামাল খান সুজনের অকালমৃত্যু কর্মস্থলে এমনই এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তাঁর চলে যাওয়া দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের কর্মজীবনের একটি পরিচিত অধ্যায়কে থামিয়ে দিয়েছে। ১৮ অক্টোবর রাতে হাসিমুখে অফিসের কাজ শেষ করে সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পরদিন তাঁর নিথর দেহ ফিরে আসার সংবাদ সহকর্মীদের স্তব্ধ করে দেয়।
সুজনের ব্যবহৃত কম্পিউটার, কর্মস্থল ও কাজের স্মৃতি এখনো রয়েছে। নেই শুধু তিনি। তাঁর হাসিমুখ, কর্মনিষ্ঠা, সহকর্মীদের সঙ্গে আন্তরিকতা এবং কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ বারবার মনে পড়ছে। দীর্ঘ ছয় বছর দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার পেছনে নেপথ্য শ্রম দিয়েছেন।
সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, কম্পোজ, পৃষ্ঠাসজ্জা, প্রুফ দেখা, ছাপা ও পাঠকের হাতে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া—প্রতিটি ধাপেই বহু মানুষের সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। এই কর্মপরিবেশে সুজন ছিলেন পরিচিত, দক্ষ ও দায়িত্বশীল একজন সহকর্মী। তাঁর অনুপস্থিতিতে কাজ চলবে, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া যাবে; কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাস, সম্পর্ক ও স্মৃতির শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
সার্কুলেশন ম্যানেজার সোহাঈদ খান জিয়ার সঙ্গে সুজনের খুনসুটি ছিল অফিসের পরিচিত দৃশ্য। তাঁদের কথাবার্তা, হাসি-ঠাট্টা ও পারস্পরিক মন্তব্য কর্মপরিবেশে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করত। এখন সেই কথোপকথন আর হবে না। কোনো আলোচনায় হয়তো মনে পড়বে, সুজন থাকলে কী বলতেন।
কোনো বিষয়ে মতানৈক্য হলে সুজন অনেক সময় চুপ করে যেতেন। বাইরে থেকে মনে হতো, তিনি আর কথা বাড়াতে চান না। কিন্তু তাঁর নীরবতার মধ্যে অভিমান জমে থাকত বলে মনে হতো। তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই মুহূর্তগুলো নতুন করে মনে পড়ছে। মৃত্যুর পর অনেক কথাই আর বলা যায় না, অনেক অভিমান মেটানোর সুযোগও থাকে না।
সুজনের মধ্যে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ও উদ্ভাবনী চেতনা ছিল। কম্পিউটার, পৃষ্ঠাসজ্জা, ডিজিটাল যোগাযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তিত পদ্ধতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার আগ্রহ তাঁর ছিল। নেপথ্যের কর্মীদের শ্রম ছাড়া সংবাদপত্রের নিয়মিত প্রকাশনা কঠিন—সুজন ছিলেন সেই গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের একজন।
সুজন প্রায়ই বলতেন, “আপনাকে কেউ আর ধরতে পারবেন না, আপনি অনেক উপরে উঠবেন।” তাঁর এই কথায় ছিল উৎসাহ, বিশ্বাস ও শুভকামনা। বয়সে সমান হলেও তিনি সব সময় ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। তাঁর সেই ভদ্রতা ও আন্তরিকতা এখন স্মৃতির অংশ।
আজ তাঁকে আর বলা হবে না যে তাঁর কথাগুলো মনে আছে, তাঁর বিশ্বাস ভুলে যাওয়া হয়নি। জীবিত অবস্থায় বলা হয়ে ওঠেনি এমন কথাগুলোই এখন শোকের গভীর অংশ হয়ে আছে।
সুজনের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারও গভীর বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তাঁর স্ত্রী স্বামীকে, মা সন্তানকে এবং ভাইবোনেরা ভাইকে হারিয়েছেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলে হারিয়েছে তাদের বাবাকে। সন্তানদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে বাবার অনুপস্থিতি তাদের বারবার অনুভূত হবে।
শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সহকর্মী ও সমাজের মানবিক দায়িত্ব। সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা, সন্তানদের শিক্ষায় সহায়তা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এসব উদ্যোগ হওয়া উচিত সম্মানজনক, স্বচ্ছ এবং পরিবারের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুজনের স্মৃতি সহকর্মীদের মনে তাঁর হাসি, কর্মনিষ্ঠা, আন্তরিকতা, শেখার আগ্রহ ও উৎসাহ দেওয়ার অভ্যাসের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে। তাঁর অনুপস্থিতি কর্মস্থলের প্রতিদিনের পরিচিত দৃশ্যগুলোকে বদলে দিয়েছে; কাজ চলবে, কিন্তু তাঁর জায়গাটি স্মৃতিতে অপূরণীয়ই থেকে যাবে।