
ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চাঁদপুরের উপপরিচালক মো. সেলিম সরকার বলেছেন, শিশুদের নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে প্রতিটি মসজিদে মক্তব শিক্ষা চালু করা জরুরি। ২০০১ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে যোগ দেওয়ার পর নরসিংদী, ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জে দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে চাঁদপুরে কাজ করছেন তিনি। মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা, ইমাম-মোয়াজ্জিনদের প্রশিক্ষণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার ওপর গুরুত্ব দেওয়া এই কর্মকর্তা সম্প্রতি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, দায়িত্ব ও সমাজের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
সেলিম সরকার জানান, তাঁর ছাত্রজীবনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবার ও সমাজ শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ১৯৮৮ সালে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তাঁর মতে, পড়াশোনাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে নেওয়া উচিত। নিজের বর্তমান অবস্থানে আসার পেছনে বাবার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি জীবনের নানা সংকটে স্ত্রীও তাঁকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বলে জানান।
তিনি বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কাজের মাধ্যমে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের কল্যাণ ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য কাজ করার সুযোগ রয়েছে। ৪ মার্চ ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেওয়ার আগে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে কাজ করেন তিনি। তাঁর প্রথম পদায়ন হয় নরসিংদীতে। পরে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও আবার ঢাকায় দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে চাঁদপুরে কর্মরত আছেন।
চাঁদপুরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালনা ও তদারকি করা হয়। সেলিম সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১ হাজার ২৪০টি কেন্দ্র ও সমসংখ্যক শিক্ষক রয়েছেন। ১৯টি মাদ্রাসায় দারুল আরকাম প্রকল্পের কার্যক্রম এবং মসজিদভিত্তিক পাঠাগারও পরিচালিত হচ্ছে। বড় জনবলকে সঠিকভাবে তদারকি করা এবং মানুষকে যথাযথ সেবা দেওয়া নিশ্চিত করাকে তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মসজিদভিত্তিক শিক্ষা শিশুদের কোরআন শিক্ষা, আদব-কায়দা, বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করার শিক্ষা দেয় বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, এই শিক্ষা নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে সহায়ক এবং নৈতিক অবক্ষয়, মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক সমস্যা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। মুসলিম শিশুদের কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের শিশুদের নিজ নিজ ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত বলেও তিনি মত দেন।
সেলিম সরকার জানান, ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির মাধ্যমে ইমামদের ৪৫ দিনের মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গবাদিপশু পালন, কৃষি, বন, মৎস্য, প্রাথমিক চিকিৎসা, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরিমাপের বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চাঁদপুরে ৯৬ জন ইমাম, ৯৫ জন মোয়াজ্জিন ও ৯৪ জন খাদেমসহ মোট ২৮৫ জনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ইমামকে ৫ হাজার, মোয়াজ্জিনকে ৩ হাজার এবং খাদেমকে ২ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৩৯টি প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। কর্মদিবসে গড়ে দুটি প্রশিক্ষণ বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম হয়, যেখানে প্রতিটিতে ৩০ থেকে ৪০ জন অংশ নেন। মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ করা হয়।
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রায় এক হাজার মানুষ অংশ নেন।
তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে শৈশব থেকেই নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার চর্চার ওপর জোর দেন সেলিম সরকার। তাঁর মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সমাজ—সব জায়গা থেকে শিশু-কিশোরদের মূল্যবোধ শেখাতে হবে। তরুণদের পড়াশোনা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও বই পড়ার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি মক্তব শিক্ষা আবার শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কোরআন-হাদিসের সঠিক শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন বই প্রকাশ ও মসজিদে পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তরুণদের মোবাইলে অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তাদের বই পড়া ও পাঠাগারমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেন এই কর্মকর্তা।