
পল্টন ও শাহবাগ বাংলাদেশের মানুষের হয়ে কথা বলে। মানুষ যখন অন্যায়, বৈষম্য, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছে, তখন রাজপথ বহুবার সেই ক্ষোভের ভাষা হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানটি জনগণের হয়ে কথা বলার জন্য তৈরি, সেই জাতীয় সংসদ কী করে?
জনগণ বহুবার ভোট দিয়েছে, সরকার ও সংসদ বদলেছে, ক্ষমতার মুখ পরিবর্তিত হয়েছে। তবু দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, লুটপাট ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বারবার ফিরে আসে। এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ৩৫০ সদস্যের—৩০০ জন সরাসরি নির্বাচিত এবং ৫০টি নারী সংরক্ষিত আসনের সদস্য। সংসদ আইন প্রণয়নের পাশাপাশি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এবং সংসদীয় কমিটিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করে। SOURCE MATERIAL অনুযায়ী, বর্তমান ১৩তম সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ২৭ আগস্ট ২০২৬ থেকে চলছে।
সংসদ সদস্য হওয়া সম্মান পাওয়ার সুযোগ নয়; এটি জনগণের আমানত বহনের দায়িত্ব। ক্ষমতায় থাকার সুবিধা নয়, জনগণের কাছে হিসাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। প্রশ্ন হলো, জনগণের প্রতিনিধিরা ক্ষমতায় যাওয়ার পরও জনগণের প্রতিনিধি থাকেন কি না, নাকি দল, পরিবার, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিস্বার্থের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।
দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। তবে প্রতিটি অভিযোগ সত্য নয়, আবার প্রতিটি অভিযোগ মিথ্যাও নয়। তাই প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনের ভিত্তিতে বিচার। দলীয় পরিচয় যেন সত্য-মিথ্যার চেয়েও বড় হয়ে না ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সংসদ সত্যিই জনগণের হলে শুধু বিরোধী দলের অন্যায় নয়, নিজের দলের অন্যায়েরও হিসাব নিতে হবে। আগের সরকারের কাজের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডেরও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্রের বড় পরীক্ষা হলো নিজের লোকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজন কঠোর আইন, স্বাধীন তদন্ত, কার্যকর বিচার, অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে তা উদ্ধারের ব্যবস্থা করা দরকার।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে, জনগণের ক্ষোভ অনন্তকাল উপেক্ষা বা দমন করে রাখা যায় না। এই শিক্ষা সব রাজনৈতিক দলের জন্য। বর্তমান ১৩তম সংসদের সামনে তাই প্রশ্ন—এটি কি পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে?
রাজপথ রাষ্ট্রের বিকল্প সংসদ নয়; এটি সংসদের জন্য সতর্কবার্তা। প্রতিষ্ঠান জনগণের কথা শুনতে ব্যর্থ হলে রাজপথ সেই নীরবতা ভেঙে দেয়। তবে এমন একটি সংসদ প্রয়োজন, যেখানে মানুষের ক্ষোভ রাজপথে বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই তার কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
যে অন্যায় করে সে অপরাধী। কিন্তু অন্যায় দেখেও স্বার্থের কারণে নীরব থাকা, অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেওয়া বা দলীয় পরিচয়ের কারণে তাকে রক্ষা করাও অন্যায়ের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে। তাই পরিচয় নয়, কাজের ভিত্তিতে বিচার, এক আইন এবং এক জবাবদিহিতার দাবি সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ জনগণের, রাষ্ট্র জনগণের এবং ক্ষমতার উৎস জনগণ। মানুষ আর শুধু বক্তৃতা শুনতে চায় না; তারা কাজ, হিসাব ও জবাবদিহিতা চায়। যারা জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের কাছে প্রশ্ন—জনগণের ক্ষমতা নিয়ে তারা জনগণের জন্য কী করেছে?