
জাপানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সম্পর্ক যাঁদের, তাঁদের কাছে গত কয়েক দশকের পরিবর্তনটি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনের অভিজ্ঞতা। একসময় জাপানে আসার অর্থ ছিল ভাষা শেখা, পড়াশোনা করা, কাজের সুযোগ পাওয়া এবং ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করে নেওয়া। কিন্তু দেশটির জনসংখ্যাগত বাস্তবতা, শ্রমবাজার, অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো বদলে যাওয়ায় বিদেশিদের প্রয়োজন যেমন বেড়েছে, তেমনি তাদের প্রবেশ ও বসবাস ঘিরে রাষ্ট্রীয় নজরদারি, প্রশাসনিক শর্ত এবং আর্থিক দায়ও বেড়েছে। তাই জাপানকে শুধু বিদেশিবান্ধব বা বিদেশিবিরোধী—এই দুই সরল পরিচয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
জাপানের অর্থনীতি, শিল্প, সেবা, শিক্ষা ও পর্যটন খাতে বিদেশিদের উপস্থিতি বাড়ছে। ২০২৬ সালের সরকারি নথিতে জাপানি ও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানকে লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার, অবৈধ অবস্থান, ভুয়া বা দুর্বল ব্যবসা, সামাজিক বিমা ও করের বকেয়া এবং প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়ে সরকার কঠোর হচ্ছে। ফলে জাপানের দরজা বন্ধ নয়, তবে সেখানে প্রবেশ ও বসবাসের শর্ত আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে।
বাংলাদেশিদের অনেকে শিক্ষার্থী হিসেবে জাপানে যান। কেউ ভাষা স্কুলে, কেউ উচ্চশিক্ষায়, আবার কেউ পেশাগত শিক্ষায় ভর্তি হন। পরে তাঁদের কেউ প্রকৌশলী, মানবিক ও আন্তর্জাতিক সেবাভিত্তিক পেশাজীবী, নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী, কেয়ারগিভিং কর্মী বা ব্যবসায়ী হিসেবে এগিয়ে যান। পরিবারভিত্তিক থাকার অনুমতি, জাপানি নাগরিকের সঙ্গে বিবাহসূত্রে বসবাস এবং দীর্ঘদিনের বৈধ বসবাসের পর স্থায়ী বসবাসের সুযোগও রয়েছে।
এখন শুধু প্রবেশের কারণ নয়, জাপানে থাকার পুরো সময়ের জীবনযাপনও গুরুত্ব পাচ্ছে। শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, কর্মীর কাজের সঙ্গে থাকার অনুমতির সামঞ্জস্য, ব্যবসার বাস্তবতা, পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা এবং কর ও সামাজিক বিমার দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে জাপানে থাকা কেবল ভিসা পাওয়ার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক দায়িত্বেরও বিষয়।
ভাষা স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে জাপানে এসে কাজের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ গড়ার পথটি বৈধ হলেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাই থাকার মূল উদ্দেশ্য। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় পার্টটাইম কাজের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে, কিন্তু শিক্ষার দায়িত্ব অবহেলা করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই জাপানে যাওয়ার আগে শিক্ষার মান, মোট খরচ, ভাষাগত সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ চাকরি ও পরবর্তী থাকার অনুমতির সম্ভাবনা বিবেচনা করা জরুরি।
‘গিনো’ বা Technical Intern Training-এর মাধ্যমে আসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পর জাপান নতুন দক্ষতা-উন্নয়নভিত্তিক কর্মব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এতে বোঝা যায়, বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও ভবিষ্যতে জাপান দক্ষতা অর্জন করে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল হতে পারে—এমন কর্মীকে গুরুত্ব দিতে চায়।
জাপানে প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, মানবিক ও আন্তর্জাতিক সেবার পেশাজীবী, নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী, দক্ষ শ্রমিক, কেয়ার কর্মী, শিক্ষক, গবেষক ও অধ্যাপকদের জন্য আলাদা কাঠামো রয়েছে। তাই চাকরি পাওয়া মানেই যেকোনো কাজ করার অধিকার পাওয়া নয়। কাজের ধরন ও থাকার অনুমতির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। চাকরি হারানো, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন বা কাজের ধরন বদলের সময় এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যাটাস থাকলেও জাপানে ‘ইমাম ভিসা’ বা ‘মুয়াজ্জিন ভিসা’ নামে আলাদা কোনো থাকার অনুমতি নেই। ফলে দালাল বা পরিচিতজনের কথার বদলে সরকারি নিয়ম যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য Business Manager পথটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাগজে কোম্পানি তৈরি করে শুধু থাকার অনুমতি নেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে ব্যবসার বাস্তবতা, ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচাই করা হচ্ছে। প্রকৃত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কাগুজে উদ্যোক্তার মধ্যে ন্যায়সংগত পার্থক্য করা এখন নীতিনির্ধারণের বড় বিষয়।
Permanent Residence বা PR দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের নিরাপত্তা বাড়ায়, কিন্তু কর, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা ও অন্যান্য নাগরিক দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয় না। ঠিকানা পরিবর্তন, চাকরি বদল এবং সরকারি নথির হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই জাপানে থাকা বাংলাদেশিদের নিজেদের কর, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা, চাকরি ও প্রয়োজনীয় নথির তথ্য নিজে বুঝে রাখা দরকার।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে জাপানের ভিসা ফি সংশোধিত হয়েছে। সাধারণ একক প্রবেশ ভিসার ফি প্রায় ১৫ হাজার ইয়েন এবং বহুবার প্রবেশের ভিসার ফি প্রায় ৩০ হাজার ইয়েন নির্ধারণ করা হয়েছে; জাতীয়তা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফি ভিন্ন হতে পারে। অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করলে অতিরিক্ত সেবাশুল্ক থাকতে পারে।
ভিসা ফি ছাড়াও আবেদনকারীর জন্য নথিপত্র, অপেক্ষা, যোগ্যতার প্রমাণ ও অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পর্যটন ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাড়ানোর পাশাপাশি আবেদনপ্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য রাখাও জাপানের জন্য চ্যালেঞ্জ।
আজ যে বাংলাদেশি ত্রিশ বা চল্লিশ বছর বয়সে জাপানে কাজ করছেন, ভবিষ্যতে তিনি ৬৫ বা ৭০ বছরের মানুষ হতে পারেন। তখন আয় কমে গেলে, কাজের সামর্থ্য না থাকলে, পেনশন ও চিকিৎসার ব্যয় কীভাবে চলবে—এসব প্রশ্ন এখনই বিবেচনা করা প্রয়োজন। PR থাকলে বয়সের কারণে হঠাৎ বসবাসের অধিকার শেষ হয় না এবং যোগ্য বিদেশিরা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অংশ নিতে পারেন। তবে পেনশন রেকর্ড, স্বাস্থ্যবিমা, সঞ্চয়, বাসস্থান ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগাম পরিকল্পনা জরুরি।
জাপান বিদেশিদের জন্য কাজ, শিক্ষা, ব্যবসা ও দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ রাখছে। তবে প্রশাসনিক প্রত্যাশা বাড়ছে। কাজের বৈধতা, ব্যবসার বাস্তবতা, কর, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা, ভিসা, নথি ও ফি—সব ক্ষেত্রেই নিয়ম মেনে চলার গুরুত্ব বাড়ছে। রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সময় অবৈধ বা কাগুজে ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিন নিয়ম মেনে বসবাস করা বিদেশিদের পার্থক্য ন্যায়সংগতভাবে করা।
বাংলাদেশিদের জন্য জাপানে যাওয়ার আগে শুধু কোন ভিসা সহজ—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। শিক্ষা, দক্ষতা, পরিবার, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে কোন পথ সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা বিবেচনা করতে হবে। জাপানে যাওয়ার পর নিজের স্ট্যাটাস, কর, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা ও সরকারি প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি। আগামী দিনের জাপানে বিদেশিদের অবস্থান নির্ধারিত হবে আইন মেনে চলা, দায়িত্বশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে।