
উদ্যোক্তা সেলিম খান ইয়র্ক গ্রুপ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। চাঁদপুরের এই সন্তান ১৯৮১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচের কলেজ অব পাম বিচেসে বিজনেস বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি ও ব্যবসায় যুক্ত থাকার পর ১৯৯২ সালে দেশে ফিরে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই ভাবনা থেকে ১৯৯৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ইয়র্ক ফ্যাশন লিমিটেড’। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুরেই কাজ করছেন প্রায় ১ হাজার ৪শ’ জন। শ্রমিকদের মজুরি বাবদ বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে বছরে প্রায় ৩শ’ কোটি টাকার রপ্তানি আয় হচ্ছে।
২৯ বছরের পথচলায় ইয়র্ক গ্রুপ চাঁদপুরের বাবুরহাট ও নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর বিসিক শিল্পনগরীতে দুটি গার্মেন্টস হাউসসহ নিটিং, ডাইং, প্রিন্ট ও এমব্রয়ডারি কারখানা গড়ে তুলেছে। সেলিম খান বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য। তিনি চাঁদপুর জেলা বিসিক শিল্পনগরী শিল্প মালিক সমিতি এবং জেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমিউনিটি পুলিশিং সমন্বয় কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের ভালোবাসাকে তিনি নিজের অন্যতম বড় অর্জন মনে করেন।
সেলিম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে দেশে ফিরে বিভিন্ন কারখানা থেকে পণ্য কিনে রপ্তানি শুরু করেন তিনি। সময়মতো পণ্য তৈরি ও শিপমেন্ট না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে নিজস্ব কারখানা স্থাপনের চিন্তা করেন। ১৯৯৭ সালে মিরপুরে ভাড়া করা একটি ফ্লোরে ৩৫টি মেশিন দিয়ে ইয়র্ক ফ্যাশনের যাত্রা শুরু হয়।
ব্যবসার শুরুর দিকে লাইসেন্সসহ নানা কাজে দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার।
সেলিম খান বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং ক্রেতারা কম দামে পণ্য নিতে চান। একই সময়ে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। খরচ ও অপচয় কমানোর পাশাপাশি দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোকে তিনি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর দাবি, উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ নিজেদের মধ্যে রাখায় সময় ও খরচ কমেছে। আগে একটি শিপমেন্ট শেষ করতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগলেও এখন ৯০ দিনের মধ্যে তা করা সম্ভব হয়।
পোশাক খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কথা বলেছেন সেলিম খান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে চাঁদপুরের কারখানায় এক মাসে ১৬ হাজার ৩শ’ লিটার এবং নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরের কারখানায় মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে সাড়ে ৯শ’ লিটার ডিজেল ব্যবহার করতে হয়েছে। গ্যাসের সমস্যায় এক মাসে ডাইং সেকশন পাঁচ দিন বন্ধ রাখার কথাও জানান তিনি।
চাঁদপুর বিসিক শিল্পনগরীতে রাস্তা, ড্রেনেজ ও নিরাপত্তা সমস্যার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।
সেলিম খান জানিয়েছেন, শ্রমিকদের চিকিৎসা, যাতায়াত এবং জমি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণের মতো সহায়তা দেয় ইয়র্ক গ্রুপ। চাঁদপুরের কারখানায় শ্রমিকদের যাতায়াতের জন্য বাসের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ভবিষ্যতে আধুনিক ও দক্ষ মেশিন কিনে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। চাঁদপুরে অ্যাকসেসরিজ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তাঁর পরামর্শ—পরিশ্রম, ধৈর্য, হতাশ না হওয়া এবং নিজের ব্যবসা সম্পর্কে ভালোভাবে জানা।