
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছের পাশাপাশি নদী, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার বন্ধ রাখা শুধু সরকারি নির্দেশনা নয়, ভবিষ্যৎ ইলিশ সম্পদ রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসন মা ইলিশ সংরক্ষণে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার করলে কমপক্ষে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং নিবন্ধিত জেলে কার্ড বাতিলের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। নদীতে নজরদারি, খালের মুখ বন্ধ, বরফকলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন, চেকপোস্ট ও কুইক রেসপন্স টিম গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন মূল বিষয়।
শুধু নদীতে জাল ফেলা জেলেকে আটক করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। অবৈধ জাল সরবরাহকারী, মাছ পরিবহনকারী, মজুদদার ও ক্রেতা-বিক্রেতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় যেন আইনের প্রয়োগকে দুর্বল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারেন।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কাউকে ছাড়িয়ে নেওয়া, অভিযানে বাধা দেওয়া বা অবৈধ মাছ শিকারে জড়িতদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হলে প্রশাসনের উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃত্বের উচিত মা ইলিশ রক্ষায় দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করার বিষয়ে কার্যকর অবস্থান নেওয়া।
তবে শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞার সময়ে চাঁদপুরের ৪১ হাজার ৩৯০ জন নিবন্ধিত জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ঋণের কিস্তির চাপ থেকে জেলেদের সুরক্ষা এবং বিকল্প আয়-রোজগারের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ক্ষুধার তাড়নায় কোনো জেলে আইন ভাঙতে বাধ্য না হন।
মা ইলিশ রক্ষায় আইন কঠোর হলেও প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সদিচ্ছার ওপরই এবারের অভিযানের সাফল্য নির্ভর করছে।