
দেশের উত্তর প্রান্ত পঞ্চগড়কে দক্ষিণ-পূর্বের পর্যটননগরী কক্সবাজারের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগের আওতায় আনতে বড় ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। প্রায় ১ হাজার ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেল করিডোর আধুনিকায়ন ও নতুন রেললাইন নির্মাণে নেওয়া হয়েছে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে পঞ্চগড় থেকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রায় ২০টি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু এবং পুরো করিডোরে প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। আগামী পাঁচ বছর বা কিছুটা বেশি সময়ের মধ্যে কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল করিডোরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো হলো সান্তাহার-বগুড়া, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ, টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ উন্নয়ন ও নির্মাণ।
টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-দোহাজারী এবং সান্তাহার-বগুড়া অংশে ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ ও বিদ্যমান রেলপথ উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ অংশে নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আনুমানিক ব্যয়ের মধ্যে চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশে প্রায় ১০ হাজার কোটি, বগুড়া-সিরাজগঞ্জে ১২ হাজার কোটি, লাকসাম-চট্টগ্রামে ১৫ হাজার কোটি, টঙ্গী-আখাউড়ায় ১৪ হাজার কোটি এবং সান্তাহার-বগুড়া রেলপথ উন্নয়নে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
সান্তাহার হয়ে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রুট চালু হলে বর্তমান রেলপথের তুলনায় প্রায় ১১৪ কিলোমিটার দূরত্ব কমবে। এতে উত্তরাঞ্চল থেকে রাজধানী ও দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ দ্রুততর হওয়ার পাশাপাশি দুই অঞ্চলের রেল নেটওয়ার্ক আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হবে।
নতুন করিডোরের অন্যতম সুবিধা হবে পণ্য পরিবহন। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সরাসরি মালবাহী ও কনটেইনার ট্রেন পরিচালনার সুযোগ বাড়তে পারে। রেলওয়ের ধারণা, এ ধরনের ট্রেন চলাচল বর্তমানের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে পাঠানো যাবে। একইভাবে কক্সবাজার ও দক্ষিণাঞ্চলের লবণ, সামুদ্রিক মাছ ও শুঁটকি উত্তরাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় কম সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয়ও কমতে পারে।
সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে উত্তরাঞ্চলের পাহাড়, প্রকৃতি ও সীমান্ত এলাকার পর্যটনকেন্দ্র থেকে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রেলের আয়ও বাড়তে পারে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদে দেশের রেলব্যবস্থাকে ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে দেশের অধিকাংশ রেলপথকে এই নেটওয়ার্কে নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) অর্থায়নে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন প্রকল্পের অনুমোদন হয়েছে। বর্তমানে টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরির কাজ চলছে এবং আগামী জানুয়ারিতে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ও প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, পঞ্চগড় থেকে পার্বতীপুর হয়ে সান্তাহার পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেললাইন রয়েছে। মিটারগেজের মাধ্যমে পঞ্চগড়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যোগাযোগ থাকলেও এসব সংযোগকে পূর্ণাঙ্গ ব্রডগেজ নেটওয়ার্কে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ মিসিং লিংক পূরণে কাজ চলছে। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাঁচ বছর বা তার কিছু বেশি সময় লাগতে পারে। লক্ষ্য হচ্ছে উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত একটি সমন্বিত, আধুনিক ও নিরবচ্ছিন্ন রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।