
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, গবেষণা ও যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে। তবে এই অগ্রগতির আড়ালে ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকট তৈরি হচ্ছে, যার একটি দিক হলো এআই-নির্ভর ডেটা সেন্টারের কারণে পানীয় জলের ওপর সরাসরি ও পরোক্ষ চাপ।
এআই মডেল প্রশিক্ষণ, তথ্য সংরক্ষণ এবং বিপুলসংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর, সার্ভার ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হয়। এসব যন্ত্র প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। সার্ভার ঠাণ্ডা রাখতে কুলিং টাওয়ার, চিলার ও বাষ্পীভবনভিত্তিক ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হয়।
বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, বৃহৎ ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামোর পানি ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিছু হিসাবে এআই-সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পানি ব্যবহারের পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি লিটার। এই পানি নদী, ভূগর্ভস্থ উৎস বা পৌর সরবরাহব্যবস্থা থেকে নেওয়া হতে পারে। ফলে পানীয়, কৃষি ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির সঙ্গে প্রযুক্তির চাহিদার প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত জিপিইউ একই সময়ে বিপুলসংখ্যক গণনা সম্পন্ন করে এবং দীর্ঘসময় কাজ করার সময় বেশি তাপ উৎপন্ন করে। যথাযথ শীতলীকরণ না হলে প্রসেসর ক্ষতিগ্রস্ত, কর্মক্ষমতা কমে বা সার্ভার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পানিনির্ভর কুলিং ব্যবস্থায় পানি গরম হয়ে বাষ্পে পরিণত হয় এবং এর একটি অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় ফিরে আসে না।
এআইয়ের পানির ব্যবহার শুধু সার্ভার ঠাণ্ডা রাখায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও পানি লাগে, বিশেষ করে কয়লা, গ্যাস ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায়। কিছু কুলিং ব্যবস্থায় ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চমানের পরিশোধিত পানিও প্রয়োজন হতে পারে।
গবেষক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্লোজড-লুপ লিকুইড কুলিং, রিসাইকেল করা বা পরিশোধিত বর্জ্য পানি এবং বৃষ্টির পানি ব্যবহারের মতো পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। শীতল অঞ্চলে ডেটা সেন্টার স্থাপন করলে বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ব্যবহার করে সার্ভার ঠাণ্ডা রাখা সম্ভব হতে পারে। দক্ষ এআই মডেল ও কম বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী চিপ তৈরি হলেও পানি ব্যবহারের চাপ কমতে পারে।
এআই কোম্পানিগুলোর পানির ব্যবহার প্রকাশে সরকারি নীতিমালা এবং ওয়াটার-পজিটিভ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া ভারী এআই কাজ, যেমন বারবার ছবি বা ভিডিও তৈরি, এড়িয়ে চলার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরাও পরোক্ষ পানি অপচয় কমাতে পারেন।
এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্ভাবনা তৈরি করলেও তা যদি বিশুদ্ধ পানির অধিকারকে হুমকিতে ফেলে, তবে উন্নয়নের ধারণা নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎকে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।