
সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী, সর্বশেষ রাসুল ও বিশ্বমানবতার পথপ্রদর্শক হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি।
ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে শিরক, কুসংস্কার, গোত্রীয় হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যায়, সুদ, মদ্যপান, জুয়া, নারী নির্যাতনসহ নানা সামাজিক অনাচার প্রচলিত ছিল। এমন সময়ে মহান আল্লাহ মানবজাতির হিদায়াতের জন্য তাঁর সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রেরণ করেন। কোরআনে তাঁকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার কুরাইশ গোত্রের বনি হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতা আমিনা বিনতে ওহাব। জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ থাকলেও সহিহ হাদিসে তাঁর সোমবার জন্মগ্রহণের কথা জানা যায়। শৈশবেই তিনি পিতা ও পরে মাকে হারান। দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন।
যৌবনে তিনি সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও উত্তম চরিত্রের জন্য মক্কার মানুষের কাছে ‘আল-আমিন’ ও ‘আস-সাদিক’ নামে পরিচিত হন। ২৫ বছর বয়সে হযরত খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ করেন। তিনি নবুওয়াতের প্রথম যুগের অন্যতম প্রধান সহায়ক এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।
চল্লিশ বছর বয়সে হেরা গুহায় তাঁর কাছে প্রথম ওহি আসে। ‘পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’—এই আয়াতের মাধ্যমে ওহির সূচনা হয়। এরপর তিনি আল-কুরআনের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন। প্রথমে নিকটজন ও বিশ্বস্তদের মধ্যে এবং পরে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি এক আল্লাহর ইবাদত, শিরক বর্জন, সত্যবাদিতা, আমানত রক্ষা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও মানুষের অধিকার আদায়ের আহ্বান জানান।
দাওয়াতের কারণে মক্কার মুশরিকদের নির্যাতন নেমে আসে। বহু সাহাবি কঠিন নির্যাতন সহ্য করেন। তায়েফে দাওয়াত দিতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত ও পাথর নিক্ষেপে আহত হলেও মহানবী (সা.) প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি; তাঁর জীবনে ধৈর্য, দয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
কুরাইশদের হত্যার ষড়যন্ত্রের পর আল্লাহর নির্দেশে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে মসজিদে কুবা ও পরে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা, মুহাজির-আনসারের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন এবং ন্যায়, শান্তি ও পারস্পরিক অধিকারের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তোলেন। বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে চুক্তি এবং মদিনা সনদের মাধ্যমে মুসলিম ও অমুসলিম সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
মক্কা বিজয়ের সময় তিনি বিজয়ী হয়েও সাধারণ ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বিদায় হজে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা, নারীর অধিকার, আমানতদারি, সুদ বর্জন ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
হিজরি ১১ সালের রবিউল আউয়াল মাসে সোমবার ৬৩ বছর বয়সে মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর রেখে যাওয়া কোরআন, সুন্নাহ ও আদর্শ আজও মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ।
তাঁর জীবন থেকে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, আল্লাহর আনুগত্য, নামাজ ও ইবাদতের গুরুত্ব, মাতা-পিতার সম্মান, নারী ও দুর্বল মানুষের অধিকার, প্রতিবেশীর হক, ক্ষমা, সহনশীলতা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও বিপদে ধৈর্যের শিক্ষা পাওয়া যায়। তাঁকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসার প্রমাণ হলো তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করা।