
নিজস্ব প্রতিনিধি: রোববার সমকালে প্রকাশিত ‘যত বেশি শিক্ষিত তত বেশি বেকার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বিবিএসের ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের ফলই প্রতিফলিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, বেকারদের মধ্যে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৩ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা বেকারের হার ৭ শতাংশের কিছু বেশি, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষিত বেকার প্রায় ২ শতাংশ এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই—এমন বেকারের হার সবচেয়ে কম, ১.২৫ শতাংশ।
শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের সংকট দীর্ঘদিনের। প্রতিবছর ২০ লাখ কর্মক্ষম যুবকের মধ্যে ৯ লাখ কাজের সুযোগ পান; অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি বেকার থাকেন। শিক্ষিতদের মধ্যে এই সংকট তুলনামূলক বেশি—প্রকাশিত পরিসংখ্যান তা-ই ইঙ্গিত করছে।
দেশে কর্মবাজারের চাহিদা বিবেচনায় উচ্চশিক্ষা পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়নি। উচ্চ মাধ্যমিকের পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হচ্ছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানে সম্ভব না হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এতে উচ্চশিক্ষার মান, বাজার ও সময়ের সঙ্গে বিষয় ও কোর্সের অসংগতি এবং বেকারত্ব—এই তিনটি সংকট প্রকট হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য জানান, দেশের উচ্চশিক্ষার ৭০ শতাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ৬২ শতাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। তবে এ দায় এককভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির নয়; উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনার সামষ্টিক ঘাটতিই এর পেছনে রয়েছে।
উচ্চশিক্ষিতদের বড় অংশ সরকারি চাকরি, বিশেষ করে বিসিএসের দিকে ঝুঁকছেন। সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সময় লাগায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর অনেককে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়।
অন্যদিকে কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরি হয় বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতে। সেখানে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি এবং শিল্প খাতের উপযোগী গ্র্যাজুয়েটের অভাবে যোগ্য প্রার্থীর সংকট দেখা দেয়। এ কারণে বেসরকারি খাতে বিদেশিরা কাজ করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে সীমিত বিদেশি বিনিয়োগের কারণে বেসরকারি খাতেও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
শিক্ষিতদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়া বেকারত্বের বিকল্প হতে পারত। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, প্রচলিত কর্মসংস্থানের ধারণা এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার সীমাবদ্ধতায় অনেক তরুণ কৃষি বা ব্যবসায় যুক্ত হতে পারেন না। তুলনামূলক কম শিক্ষিতরা অনানুষ্ঠানিক কাজ, দিনমজুরি বা ছোট পেশায় যুক্ত হয়ে যান বলে আনুষ্ঠানিক বেকারের তালিকায় তাদের কম দেখা যায়।
সরকার শিক্ষিত বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত বলেই প্রতিবছর ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করেছে। তবে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নিম্নমুখী বেসরকারি বিনিয়োগ, দুর্বল শিল্প কার্যক্রম ও জ্বালানি খাতের সংকট কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিকে সীমিত করতে পারে।
তরুণদের বেকারত্ব কমাতে শিক্ষাব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজানো, উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিকল্প ভাবা এবং দক্ষতা, প্রযুক্তিজ্ঞান ও যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।