
হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা উত্তর ইউনিয়নের দক্ষিণ রূপসা গ্রামের পাঠান বাড়িতে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রবাসফেরত দেলোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। স্বামীকে নতুন জীবন দিতে কোনো দ্বিধা না করে নিজের কিডনি দানের সিদ্ধান্ত নেন স্ত্রী আকলিমা বেগম। এরপর গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ঢাকার শ্যামলী সিকেডি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সফলভাবে দেলোয়ারের শরীরে আকলিমার কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
কিন্তু কিডনি প্রতিস্থাপনের পর দেলোয়ার হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ঢাকার ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
দেলোয়ার-আকলিমা দম্পতির ১১ বছর বয়সী আফরিন জান্নান ইরা ও ৪ বছর বয়সী আশুরা জাহান ইভা নামে দুই কন্যাসন্তান রয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে গেলে পরিবারের সদস্যরা জানান, আকলিমার একমাত্র ইচ্ছা ছিল নিজের কিডনি দিয়ে স্বামীকে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। স্বামীকে হারানোর পর থেকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
দেলোয়ার হোসেনের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, “দেলোয়ার অসুস্থ হওয়ার পর তার চিকিৎসার জন্য আকলিমা নিজের জমি ও গহনা বিক্রি করেছে। এরপর স্বামীকে বাঁচাতে নিজের কিডনি পর্যন্ত দিয়েছে। বর্তমান সমাজে এমন ত্যাগ সত্যিই বিরল। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর প্রথমে আকলিমাকে জানানো হয়নি। পরে জানতে পেরে সে এখন পাগলপ্রায়। বর্তমানে তার চিকিৎসার খরচ চালাতেও আমরা হিমশিম খাচ্ছি। অসুস্থ এই বোন ও তার দুই সন্তানকে বাঁচাতে সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।”
দেলোয়ারের মা বৃদ্ধা শামছুন্নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “নিজের কিডনি দিয়েও আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারেনি পুত্রবধূ আকলিমা। এখন সে নিজেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তার চিকিৎসা এবং আমার অবুঝ দুই নাতনির পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবার সহযোগিতা চাই।”
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহির হোসেন বলেন, “স্বামীর প্রতি আকলিমা বেগমের ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এমন বিরল ঘটনার যেমন আমরা সাক্ষী হয়েছি, তেমনি দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে ব্যথিত। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।”
স্বামীকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দান করেও শেষ পর্যন্ত প্রিয় মানুষটিকে হারিয়েছেন আকলিমা। এখন স্বামীর শোক, নিজের চিকিৎসা এবং দুই শিশু কন্যার ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে আকলিমার চিকিৎসা ও দুই শিশুর পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের প্রতি মানবিক সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে।