
বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম প্রধান শিল্পী মনিরুল ইসলাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে স্পেনে বসবাস করলেও তাঁর শিল্পের গভীরে রয়েছে বাংলাদেশের নদী, প্রকৃতি, স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি চাঁদপুরে তাঁর নিজ বাসভবনে লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ ফরিদ হাসানের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প, জয়নুল আবেদিনের স্মৃতি, স্পেনে যাত্রা, শিল্পদর্শন এবং নারী শিল্পীদের অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
মনিরুল ইসলাম জানান, শিল্পী হওয়ার জন্য তাঁর কোনো সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল না; সহজাত বোধ ও আবেগ তাঁকে হাতের কাজের দিকে টেনে নিত। শৈশবে স্কুলের দেয়ালপত্রিকায় শিরোনাম লেখা ও অলংকরণ করতেন তিনি। কার্টুন দেখে সহপাঠীদের আগ্রহ তাঁকে কাজের প্রতি উৎসাহিত করত।
কিশোরগঞ্জে বেড়ে ওঠার সময় নরসুন্দা নদী এবং চাঁদপুরের মেঘনা তাঁর শিল্পচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্যে, মানুষ যত দূরেই থাকুক, জন্মভূমির প্রতি একধরনের চুম্বকীয় ও আধ্যাত্মিক টান থেকে যায়। স্পেনে যাওয়ার পরও দেশের বাড়ি ও স্মৃতির প্রতি সেই মায়া অটুট রয়েছে তাঁর।
১৯৬৯ সালে সহকর্মী রফিকুন নবীর পরামর্শে স্পেনে যাওয়ার বৃত্তির জন্য আবেদন করেন মনিরুল ইসলাম। কয়েক মাস পর তিনি স্পেনে যাওয়ার সুযোগ পান। তাঁর বেতন তখন ২০০ টাকা হলেও যাতায়াত খরচ ছিল ৪,০০০ টাকা বলে জানান তিনি। বৃত্তিটি ছিল স্পেন ও পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশ।
রাজনৈতিক উত্তাল সময় তাঁর চিত্রচর্চাকেও প্রভাবিত করেছে বলে জানান মনিরুল ইসলাম। স্পেনে যুদ্ধ নিয়ে সাদা-কালোয় একটি সিরিজ আঁকার কথা উল্লেখ করে তিনি ফ্রান্সিসকো গোয়ার প্রভাবের কথাও বলেন। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধ ও মানুষের দুর্ভোগ তাঁর শিল্পভাবনায় বিভিন্নভাবে এসেছে।
নিজের প্রিয় ছবির প্রসঙ্গে মনিরুল ইসলাম বলেন, ছবি আঁকার পরপরই সেটি প্রিয় থাকে, পরে ধীরে ধীরে অপ্রিয় হয়ে যায়। তাঁর মতে, এই অতৃপ্তিই নতুন কাজের জন্ম দেয়। ছবি সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা—এমন ধারণার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে চাঁদপুরে আসার স্মৃতিও আলাপে উঠে আসে। মনিরুল ইসলাম জানান, আর্ট কলেজে থেকে ছবি আঁকা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন। পরে তাঁর সঙ্গে স্টিমারে চড়ে চাঁদপুরে এসে মেঘনা নদীতে নৌকায় ছবি আঁকার অভিজ্ঞতা হয়। মেঘনার বিশালতা ও ফাঁকা পরিসরের প্রভাব তাঁর ছবিতে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
নারী শিল্পীদের প্রসঙ্গে মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে ভালো নারী শিল্পী উঠে আসায় তিনি আশাবাদী। তবে পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো এবং শিল্পচর্চা নিয়ে পারিবারিক আপত্তির কারণে অনেক নারী শিল্পী প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন বলে তিনি দাবি করেন।
নিজেকে বড় শিল্পী মনে করেন না জানিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, তিনি চাঁদপুরের একজন অধিবাসী, যিনি ছবি আঁকেন। তাঁর মতে, শিল্পীর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও আলাদা জগৎ তৈরি করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। বাংলাদেশে তাঁর একটি ছবি সর্বোচ্চ ২৮ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মনিরুল ইসলাম চাঁদপুর পৌর এলাকার গুণরাজদী গ্রামের সাতানি পাটোয়ারী বাড়ির সন্তান। ১৯৯৭ সালে তিনি স্পেনের রাষ্ট্রীয় পদক পান। ২০১০ সালে তিনি স্পেনের ‘দ্য ক্রস অব দি অফিসার অব দি অর্ডার অব কুইন ইসাবেলায়’ সম্মাননা লাভ করেন।