
নিজস্ব প্রতিনিধি: বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ফোনের ফ্ল্যাশের আলোয় একটি পেঁয়াজ ও কয়েকটি শুকনো মরিচ খুঁজে নেন লেখক। ইলেকট্রিক লাইটারে আগুন জ্বালিয়ে শুকনো মরিচ ভাজার সময় পোড়া ধোঁয়ার গন্ধে কাশতে শুরু করেন তিনি। পরে অন্ধকারে ফ্ল্যাশ জ্বেলে পেঁয়াজ কেটে পান্তা ভাতের আয়োজন করেন। ভাজা ইলিশের অভাব অনুভব করার পাশাপাশি জানালা দিয়ে ভেসে আসা ঝুম বৃষ্টির শব্দ শুনতে থাকেন।
মাঝেমধ্যে মেঘের গর্জনে তাঁর মনে পড়ে যায় অতীতের কথা। ছোটবেলায় মা খাবার খেতে ডাকলেও তিনি সাড়া না দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে প্রিয় সাইমুম সিরিজের উপন্যাস পড়তেন এবং ঘুমের ভান করতেন। মা কিছুক্ষণ বকাঝকা করে চলে গেলেও তাঁর সেই ভান বুঝতে পারতেন।
কলেজ বা কাজে যেতে দেরি হলেও মা কিংবা বড় বোন তাঁকে না খেয়ে বের হতে দিতেন না। মুখের সামনে খাবার তুলে দিয়ে আগে খেয়ে নিতে বলতেন। দেরি হয়ে যাওয়ার কথা জানালেও তাঁরা খাবার খাওয়ানোর ব্যাপারে অনড় থাকতেন। তাঁদের মমতাময়ী মুখের স্বস্তি দেখে দেরির জন্য বকা শোনার কষ্টও তাঁর কাছে বড় মনে হতো না।
ফ্ল্যাশের আলোয় পোড়া মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়ে সাজানো পান্তা ভাত তাঁকে স্মৃতি থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। আবেগে চোখে পানি আসে। সেই অশ্রু পান্তা ভাতের পানির সঙ্গে মিশে যায়।
ভালো একটি কলেজে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম ছেড়ে নতুন শহরে আসার পর দুদিন না খেয়ে থাকলেও তাঁকে বকা দেওয়ার বা মুখের সামনে খাবার তুলে দেওয়ার কেউ ছিল না। পরে এক শুভাকাঙ্ক্ষী বিষয়টি জানতে পেরে তাঁর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন। অচেনা পরিবেশে ওই ব্যক্তিই ছিলেন তাঁর একমাত্র পরিচিতজন।
পরিবারের সবার সঙ্গে খাওয়ায় অভ্যস্ত মানুষটি শহরে এসে নিজ হাতে রান্না করে একা খেতে শুরু করেন। রেস্তোরাঁর খাবারেও মায়ের মমতা মেশানো রান্নার স্বাদ পাননি। বহুবার রান্না করেও সেই স্বাদ আর ফিরে আসেনি। তাঁর উপলব্ধি, এখন খাচ্ছেন বেঁচে থাকার জন্য; খাওয়ার জন্য বেঁচে নেই।
সুযোগ পেলেই তিনি বাড়ি গিয়ে মায়ের হাতে খাবার খান। মাকে বলেন, অনেক দিন তাঁর হাতে খাওয়া হয়নি, তাই খাইয়ে দিতে। পুরোনো অভ্যাসে কখনো ফোনে ব্যস্ত হয়ে বা ঘুমের ভান করে খাবার এড়িয়ে গেলে মায়ের কাছে তাঁর আবদার থাকে—খাইয়ে দিলে খাবেন। মা শেষ পর্যন্ত তাঁকে খাইয়ে দেন, আর তিনি তৃপ্তি নিয়ে খান।