
শীতকালের সকালে গ্রামের পুকুরপাড়ে গরম কাপড় গায়ে দিয়ে ছোট-বড় সবাই রোদ পোহাতে বসে সূর্যকে ডেকে বলে, ‘ও রোদওয়ালি (রইদালি), কই গেলে?’—এটি ঋতুভিত্তিক একটি লোকশ্লোক। এমন নানা শ্লোক, ছড়া ও বোলের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের বিশ্বাস, হাস্যরস, সামাজিক টানাপোড়েন, নৈতিক শিক্ষা ও লোকসংস্কৃতির নানা দিক প্রকাশ পেয়েছে।
দেশজুড়ে প্রচলিত আরেক শ্লোকে চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষার ‘মোচ’ বা গোঁফওয়ালা চুরি করা খাবারের সামান্য অংশ দাড়িওয়ালাকে দিয়ে যায়। দাড়িতে খাবার লেগে থাকায় তুলনামূলক নিরপরাধ ব্যক্তি শনাক্ত ও আটক হয়। এর মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেঁচে যাওয়া এবং নিরপরাধের দণ্ডিত হওয়ার সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।
কৃতজ্ঞতার শ্লোকে উপকারীর প্রশংসা ও আহারদাতার জয়গানের কথা বলা হয়েছে। সামাজিক টানাপোড়েনের আরেক শ্লোকে যম, মেয়ের জামাই ও ভাগিনাকে সন্তুষ্ট করা কঠিন—এমন লোকবিশ্বাস প্রকাশ পেয়েছে। কম খেয়ে কাজের শক্তি বাড়ানোর পরামর্শও রয়েছে; ভরপেট খেলে স্থূলতা ও কর্মঅক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লির এক আয়ুর্বেদিক ওষুধ প্রস্তুতকারীর পেটেন্ট করা ওষুধ ঘিরে শিশুদের ঠাট্টার ছড়ার কথাও আছে। না-বোঝার ভান করা মানুষকে বোঝানো যায় না, ক্ষমতাবানের সঙ্গে সুবিধাবাদী আত্মীয়তা জাহির করা, সতীনের রেষারেষি এবং ঝগড়ায় পিছিয়ে না আসার মানসিকতাও বিভিন্ন শ্লোকে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া চুরি করে ধরা পড়লে সেটিকে ঠাট্টা বলে চালিয়ে দেওয়া, নিজের শক্তির ওপর নির্ভরতা, অতিথিকে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা, নেমন্তন্নে মাংস খাওয়ার আনন্দ এবং শিশুকে ঘুম পাড়ানোর লোকছড়ার উল্লেখ রয়েছে। গ্রামীণ খেলায় দুই দলে ভাগ হওয়ার ডাক, দুষ্ট কিশোর-কিশোরীদের ক্ষ্যাপানোর বোল এবং ‘চি’ খেলায় এক নিশ্বাসে বলা বোলও এই ধারার অংশ।
চৈত্রসংক্রান্তির ‘জাগ দেওয়া’ পর্বে ধোঁয়া ঘরের দিকে পাঠিয়ে টাকা-পয়সা ও ধনসম্পদ কামনা করা হতো। কিচ্ছা, শিশুদের বাতকর্ম শনাক্ত করার ছড়া এবং বিপদে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও এসব লোকবয়ানে স্থান পেয়েছে। বিচ্ছিন্ন মনে হলেও শ্লোক, ছড়া ও বোলগুলো একসঙ্গে গ্রামীণ মানুষের জীবন, সম্পর্ক, রসবোধ ও অভিজ্ঞতার অখণ্ড ছবি তুলে ধরে।