
চাঁদপুর শহরের অর্ধশত থেকে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে জেলার ক্রীড়াঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাঠে খেলাধুলার হাতেখড়ি নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় শহরের পুরোনো এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই এখন পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। ফলে ক্রীড়াসামগ্রী ও শরীরচর্চা শিক্ষক থাকলেও নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে আবুল, মুকুলসহ অনেক খেলোয়াড় চাঁদপুরের ফুটবলে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে মনোয়ার চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন মানিক, জাহাঙ্গীর গাজী, গোলাম মোস্তফা বাবু, জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী ও ইউসুফ বকাউলসহ অনেকে ঢাকার মাঠ ও জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন।
চাঁদপুর পৌরসভা পরিচালিত চাঁদপুর পৌর শহীদ জাবেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রতিষ্ঠানটিতে ২৮০ ও ৩১১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এত শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ মাঠ নেই। ভেতরের চত্বরের প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট জায়গায় নিয়মিত সমাবেশ করাও কঠিন হওয়ায় সমাবেশ দুই ভাগে করতে হয়।
অধ্যক্ষের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪২ শতক জায়গা দখল হয়ে আছে। মাঠ না থাকায় নিয়মিত খেলাধুলার জন্য শিক্ষার্থীদের দূরের আউটার স্টেডিয়ামে যেতে হয়। ক্রীড়া শিক্ষক, ইনডোর গেমস এবং ফুটবল, ক্রিকেট ও ভলিবলের সরঞ্জাম থাকলেও মাঠের অভাবে নিয়মিত চর্চা সম্ভব হচ্ছে না। ‘প্রধানমন্ত্রী গোল্ডকাপ’, ‘নতুন কুঁড়ি’ ও সাঁতার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের সাফল্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুর আহম্মদিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় দুটি ভবনের মাঝের সীমিত জায়গায় সমাবেশ ও খেলাধুলা হয়। এক শিক্ষকের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, জায়গাটি সর্বোচ্চ ২৫ ফুট দীর্ঘ ও ১০ ফুট প্রশস্ত। অধ্যক্ষ মাসুম বিল্লাহ মজুমদার বলেন, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বা বড় আয়োজনের জন্য ডাকাতিয়া নদীর ওপারের চর এলাকায় যেতে হয়।
১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ডি. এন. উচ্চ বিদ্যালয়ে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ৩০৬ জন; নিয়মিত আসে প্রায় ২৫৬ জন। প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের মাঠ প্রায় ৬ শতাংশ। এতে বড় আউটডোর খেলা আয়োজন কঠিন। ক্রীড়াসামগ্রী ও শিক্ষক থাকলেও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠান বা আউটার স্টেডিয়ামের মাঠের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা গেলে প্রায় ৭০ ফুট গুণ ৬৮ ফুট মাঠ তৈরি সম্ভব বলে ২৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও আবেদনে বলা হয়।
১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় চাঁদপুরের ক্রীড়া ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা ফুটবল, ক্রিকেট ও অ্যাথলেটিকসে জেলা, বিভাগ এবং জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পেয়েছেন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে বিদ্যালয়ের ফুটবল দল কুমিল্লা হাই স্কুলকে হারিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০২২-২৩ মৌসুমে তারা জাতীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হয়। ২০২৩ সালে ক্রিকেটেও জাতীয় পর্যায়ের ফাইনালে উঠে রানার্সআপ হয়।
প্রধান শিক্ষক নাজির আহমেদ বলেন, বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ইনডোর গেমস ও বিভিন্ন ইভেন্ট হয়। জাতীয় স্কুল অ্যাথলেটিকসে শিক্ষার্থীরা পদক পেয়েছে। তবে ৮৫০ শিক্ষার্থীর জন্য মাঠ রয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের পর জায়গার ব্যবহার আরও সীমিত হয়েছে। পুরোনো ভবন ভেঙে মাঠের পরিসর বাড়ানো গেলে ঐতিহ্য ফিরতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
শহরের বিষ্ণুদী আজিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১২৩ নম্বর গুয়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও মাঠসংকট রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো ভবন অপসারণ, দখল হয়ে থাকা জায়গা পুনরুদ্ধার এবং পরিকল্পিত মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
নাজিরপাড়া ক্রীড়া চক্রের সভাপতি কাজী মাইনুল হক জীবন বলেন, নিয়মিত টুর্নামেন্ট ও ক্যাম্প না থাকায় খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া থমকে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।