
চাঁদপুর সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শাহাতলী বাজার এক সময় ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। বাজারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে যেখানে মানুষের ভিড় ঠেলে আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লেগে যেত, সেখানে এখন অনেক সময় দোকানিরাই বসে থাকেন ক্রেতার অপেক্ষায়।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, প্রায় ২৫-৩০ বছর আগেও শুক্রবার ও সোমবার হাটের দিন শাহাতলী বাজারে মানুষের ঢল নামত। আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ নৌপথে খেয়াঘাট পার হয়ে বাজারে আসতেন। কৃষিপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ নানা পণ্যের বেচাকেনায় মুখর থাকত পুরো এলাকা।
এক সময় চাঁদপুরের পূর্বাঞ্চলের মানুষের কেনাকাটা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় একটি অংশ নির্ভর করত শাহাতলী বাজারের ওপর। শুধু স্থানীয় মানুষ নয়, আশপাশের বহু গ্রামের বাসিন্দাদেরও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর অন্যতম ভরসাস্থল ছিল এই বাজার।
কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে যোগাযোগব্যবস্থাও। এরই মধ্যে আশপাশে গড়ে উঠেছে একাধিক নতুন বাজার ও মার্কেট। ফলে ক্রেতাদের নির্ভরতা ভাগ হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে কমেছে শাহাতলী বাজারের বেচাকেনা, ম্লান হয়েছে পুরোনো ব্যস্ততা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, আগে হাটের দিন দোকান খোলার আগেই ক্রেতারা এসে ভিড় করতেন। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে এসে দোকান সাজিয়ে বসতেন। দিনভর চলত বেচাকেনা। এখন অনেক দোকানে সারাদিনেও প্রত্যাশিত ক্রেতা পাওয়া যায় না। ব্যবসায় টিকে থাকতে না পেরে অনেক পুরোনো ব্যবসায়ী দোকান গুটিয়ে নিয়েছেন।
ব্যবসায়ী আমির গাজী, আক্তার খান, রিপনসহ কয়েকজন বলেন, শাহাতলী বাজারের সেই সময় আর নেই। এক সময় হাটের দিনে বাজারে তিল ধারণের জায়গা থাকত না। এখন অনেক সময় দোকানে বসে ক্রেতার অপেক্ষায় থাকতে হয়। নতুন নতুন বাজার গড়ে ওঠায় আমাদের বেচাকেনা অনেক কমে গেছে।
তাদের মতে, শাহাতলী বাজারের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। বাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার আরও আধুনিকায়ন, হাটবার নিয়মিত ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আবারও বাজারটি প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
স্থানীয় প্রবীণদের কাছে শাহাতলী বাজার শুধু একটি বাজারের নাম নয়—এটি তাদের শৈশব, যৌবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক জীবনের অসংখ্য স্মৃতির অংশ। এক সময়ের সেই কোলাহল আজ অনেকটাই স্তব্ধ হলেও মানুষের হৃদয়ে এখনও বেঁচে আছে শাহাতলী বাজারের সোনালি দিনের স্মৃতি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগে হারিয়ে যাওয়া সেই প্রাণচাঞ্চল্য আবারও ফিরবে শাহাতলী বাজারে। আবারও হাটের দিনে মানুষের পদচারণায় মুখর হবে বাজার, ফিরবে ক্রেতা-বিক্রেতার সেই চেনা ব্যস্ততা—ফিরবে শাহাতলীর হারানো ঐতিহ্য।