
বাংলাদেশের নদী-খাল, বিল-হাওর ও জলাভূমি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটির পেছনে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জলজ সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু নানা কারণে সেই বাস্তবতা সংকুচিত হচ্ছে। ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত ও ধ্বংসাত্মক মাছ শিকারের কারণে দেশীয় ছোট-বড় মাছের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়া গভীর উদ্বেগের বিষয়।
চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় রুই, কাতল, মৃগেল, কই, শিং, পুঁটি, মাগুর, চিংড়ি, মলা ও ঢেলাসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ছিল নদীটিতে। নদীটির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন বহু জেলে পরিবার। তবে অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি বা রিং জাল এবং গভীর রাতে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ শিকারের মতো পদ্ধতির কারণে মাছের প্রাচুর্য দ্রুত কমছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব পদ্ধতিতে বড় মাছের পাশাপাশি রেণু, পোনা ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীও ধ্বংস হয়। ফলে একটি অবৈধ শিকার শুধু বর্তমানের মাছ কমায় না, ভবিষ্যতের মাছের সম্ভাবনাও নষ্ট করে। প্রজননক্ষম মাছ ও পোনা ধ্বংস হলে নদীর স্বাভাবিক মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা বিপন্ন হতে পারে।
ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ শিকার জলজ পরিবেশের জন্যও গুরুতর উদ্বেগের কারণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান না থাকায় অসাধু শিকারিরা সুযোগ পাচ্ছেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। তবে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে শিগগিরই কঠোর অভিযান শুরুর কথা তিনি জানিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, সেই অভিযান কবে শুরু হবে এবং কতটা নিয়মিত ও কার্যকর হবে। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ধারাবাহিক নজরদারি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি প্রয়োজন।
শুধু অবৈধ জালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; নদীর নাব্যতা, দূষণ, দখল, পানির প্রবাহ ও মাছের প্রজননক্ষেত্রও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রকৃত জেলেদের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের বিকল্প জীবিকা, প্রজনন মৌসুমে সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
ডাকাতিয়া নদীর সংকট কেবল একটি নদীর সংকট নয়। দেশের অন্যান্য নদী-খাল ও জলাভূমিতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি পুঁটি, মলা, ঢেলা, শিং ও মাগুরসহ দেশীয় মাছ সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।