
আমরা দুজন হাসছিলাম। কেন হাসছিলাম, সে কথা আজও বলতে পারবো না। তবে যাঁর সঙ্গে হাসির সেই মুহূর্ত ভাগ করে নিয়েছিলাম, তাঁর কথা না বললেই নয়। তিনি চিকিৎসক ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরী।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার দত্তরাইল গ্রামের সন্তান কালী প্রদীপ চৌধুরী। জমিদার কালীপদ দত্ত চৌধুরীর বংশধর এই চিকিৎসকের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সিলেটে। এমসি কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড ও কানাডা হয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। তখন তাঁর পকেটে ছিল মাত্র ৮ ডলার, তবে চোখে ছিল বড় স্বপ্ন।
আমেরিকায় গিয়ে একটি হাসপাতালে চাকরির জন্য আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। এতে দমে না গিয়ে দীর্ঘ ১১ মাস চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ওই হাসপাতালেই কাজের সুযোগ পান। কয়েক মাস পর হাসপাতালের প্রশাসককে তিনি বলেছিলেন, একদিন হাসপাতালটি কিনে নেবেন। প্রশাসক তাঁর কথা শুনে হেসেছিলেন এবং মাঝেমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তাঁকে উপহাসও করতেন।
তবে ১৩ বছর পর সেই প্রশাসক দেখলেন, একসময় যে তরুণ হাসপাতালটি কেনার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, তিনি সত্যিই হাসপাতালটির মালিক হয়েছেন। এরপর শুরু হয় ‘কেপিসি গ্রুপ’-এর বিস্তৃত যাত্রা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রিয়েল এস্টেট, কৃষি, প্রযুক্তি, শক্তি ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়।
২০১৮ সালে অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তার লক্ষ্যে তিনি ‘এবাভ অ্যান্ড বিয়ন্ড রিসোর্স সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘এবাভ অ্যান্ড বিয়ন্ড অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, কেপিসি গ্রুপের হাসপাতালের সংখ্যা ছিল ৭০টি। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর প্রতিষ্ঠানের জমি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা রয়েছে; এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের সংখ্যাও কয়েক হাজার। ভারতের চা-বাগানও তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অংশ।
সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরী। বাংলাদেশে ফিরে এসে নিজ গ্রামের পৈতৃক সম্পত্তিতে বিশ্বমানের একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। ঢাকার পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ১৪২ তলা একটি আইকনিক টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনাও করেছিলেন। তবে নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোগটি এখনো সফল হয়নি।
এই প্রকল্পের প্রসঙ্গ উঠলে তিনি নীরব হয়ে যান; কাউকে দোষারোপ বা কোনো অভিযোগ করেননি। সংশ্লিষ্ট মহল থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাসের কথা জানা গেছে। স্বপ্নের ভবনটি বাস্তব রূপ পাবে কি না, তা সময়ই বলবে।
সাফল্যের চূড়ায় থেকেও তাঁর মধ্যে রয়েছে বিনয়ের দীপ্তি, চিন্তায় দূরদর্শিতা এবং মুখে নির্মল হাসি। সেই হাসিতে আনন্দ, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার প্রকাশ আছে—যা অন্যের মুখেও হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে।