
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীকে বিচার করা হয় জিপিএ-৫ দিয়ে। কে কেমন ফলাফল করল, তা দিয়েই তাকে আদর্শ ও পরিপূর্ণ শিক্ষার্থী কি না বোঝার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভালো বিতার্কিক, ফুটবলার বা সংগঠকও যে ভালো শিক্ষার্থী হতে পারে—এই ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে পাঠ্যবইয়ের বাইরের সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম স্কুল-কলেজে অবহেলিত থাকছে, जबकि সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তা বিকাশের প্রয়োজনীয়তা স্বীকারের মানসিকতা খুব কম।
খাতা-কলমে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক। জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২২-এ এটিকে মূল্যায়নের অংশও করা হয়েছে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এ কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয় না। ঢাকার নামী স্কুলগুলোতে ডিবেট ক্লাব, সায়েন্স ক্লাব, স্কাউট ও বিএনসিসি সক্রিয় থাকলেও জেলা পর্যায়ের কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের আগ্রহ সীমিত।
মফস্বল ও গ্রামের অধিকাংশ স্কুলে সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের অস্তিত্ব অনেক সময় দেয়ালে টাঙানো ব্যানারেই সীমাবদ্ধ থাকে। বছরে একবার ক্রীড়া বা বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়; সারা বছর ক্লাবভিত্তিক চর্চা থাকে না। অথচ অনেক শিক্ষার্থী আঁকা, আবৃত্তি, গান, গল্প বা কবিতা রচনায় দক্ষ।
বেশিরভাগ অভিভাবক এখনো মনে করেন, গান, আবৃত্তি বা খেলাধুলা পড়াশোনার ক্ষতি করে এবং ফল খারাপ হওয়ার কারণ হয়। এই ধারণা শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশে বাধা দেয়। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও সম্মানীর অভাবেও কার্যক্রম পরিচালনায় আগ্রহ কমে। অনেক ক্ষেত্রে গণিতের শিক্ষককে স্কাউটের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকে না।
অনেক স্কুলে স্থায়ী ডিবেট ক্লাবের কক্ষ, খেলার মাঠ বা ইনডোর গেমসের পরিবেশ নেই। বার্ষিক বাজেটে এ খাতে বরাদ্দও নামমাত্র। ফলাফলকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় প্রধান শিক্ষকের মূল্যায়ন হয় পাশের হার দিয়ে, আর শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হয় নম্বরে। ফলে ক্লাস বাদ দিয়ে বিতর্ক বা অন্য কার্যক্রমে অংশ নিলে সিলেবাস শেষ হবে না—এমন ধারণা তৈরি হয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণে সপ্তাহে অন্তত দুটি পিরিয়ড ক্লাব ডে হিসেবে নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ক্লাব পরিচালনাকারী শিক্ষকদের সম্মানী, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি স্কাউট ও বিএনসিসির মতো সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার কথা বলা হয়েছে।
অভিভাবক সমাবেশে ফলাফলের পাশাপাশি সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরা, দেয়াল পত্রিকা, বই পড়া ও পরিচ্ছন্নতা ক্লাব চালু এবং স্থানীয় সফল ব্যক্তি, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও ক্রীড়াবিদদের নিয়ে কর্মশালা আয়োজনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু জিপিএ-৫ নির্ভর প্রজন্ম তৈরি হলে ভালো চাকরিজীবী পাওয়া গেলেও ভালো নেতা, উদ্যোক্তা ও মানুষ পাওয়া যাবে না—এমন মত তুলে ধরে বলা হয়েছে, নেতৃত্ব, সহমর্মিতা, যুক্তিবোধ ও সহনশীলতার মতো গুণ মাঠ, মঞ্চ ও ক্লাবের চর্চায় বিকশিত হয়।