
একটি আগুন শুধু দোকানের মালামাল নয়, পুড়িয়ে দেয় একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। গ্রামীণ বাজারে গভীর রাতে আগুন লাগার ঘটনা তাই নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ফরিদগঞ্জ উপজেলার গৃদকালিন্দিয়া বাজারের ‘মুদি গলি’তে বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) দিবাগত রাতে আগুনে চারটি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে এবং আরও তিনটি দোকান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস। ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে প্রায় অর্ধকোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। বৈদ্যুতিক ত্রুটি, অপরিকল্পিত সংযোগ কিংবা নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ভূমিকা থাকলে তা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত তৎপরতায় আরও বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে এমন আগুন বারবার লাগার পরও গ্রামীণ বাজার ও বাড়িঘরের বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
বৈদ্যুতিক সার্কিটে নির্ধারিত পথের বাইরে অস্বাভাবিকভাবে কম বাধার পথ তৈরি হলে শর্ট সার্কিট হতে পারে। তারের ইনসুলেশন নষ্ট হওয়া, দুটি পরিবাহীর অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্পর্শ, ত্রুটিপূর্ণ সুইচ-সকেট কিংবা সংযোগস্থলের সমস্যায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে তাপ ও স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে। আশপাশে কাগজ, কাপড়, প্লাস্টিক, কাঠ বা অন্য দাহ্য পদার্থ থাকলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তবে সব বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের কারণ শর্ট সার্কিট নয়। নিম্নমানের তার ও সরঞ্জাম, অতিরিক্ত লোড, ঢিলা সংযোগ, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্র, অনুপযুক্ত ফিউজ বা সার্কিট ব্রেকার এবং দীর্ঘদিন সংযোগ পরীক্ষা না করাও আগুনের কারণ হতে পারে। তাই শুধু শর্ট সার্কিট উল্লেখ করে তদন্ত শেষ না করে প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৯২টি, অর্থাৎ ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশের কারণ ছিল বৈদ্যুতিক গোলযোগ। একই বছরে আবাসিক ভবনে ৮ হাজার ৭০৫টি, দোকানে ১ হাজার ৮০০টি এবং বাজারে ১ হাজার ৬৭টি অগ্নিকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে। এসব তথ্য বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরলেও গৃদকালিন্দিয়া বাজারের আগুনের কারণ তদন্তের আগে নির্দিষ্টভাবে বলা যাবে না।
গৃদকালিন্দিয়া বাজারের অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করে তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে গ্রামীণ বাজার ও বসতবাড়িতে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার কারণভিত্তিক পরিসংখ্যান তৈরি করা প্রয়োজন। নিম্নমানের পণ্য দায়ী হলে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী ও বিক্রেতার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ স্থাপন বা অতিরিক্ত লোড দায়ী হলে তা সংশোধনের উদ্যোগও জরুরি।
বাজারের বৈদ্যুতিক সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা, অতিরিক্ত লোড নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত তার ও সরঞ্জাম ব্যবহার, উপযুক্ত সার্কিট ব্রেকার স্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত তার দ্রুত পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে হবে। আগুন লাগলে দ্রুত খবর দেওয়া, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার এবং দোকানগুলোর মাঝে নিরাপদ চলাচলের পথ রাখাও জরুরি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি, জনপ্রতিনিধি ও বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো যেতে পারে।
গৃদকালিন্দিয়া বাজারের আগুন একটি সতর্কসংকেত। দুর্ঘটনার পর ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করার চেয়ে আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা বেশি জরুরি। বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাকে নিয়মিত তদারকি ও জনসচেতনতার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।