
নিজস্ব প্রতিনিধি: ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক ও বেতার ব্যক্তিত্ব ছিলেন দিলারা হাশেম। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ খ্যাত এই সাহিত্যিক জীবনের অনেকটা সময় আমেরিকায় কাটালেও বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে তুলনাহীন অবদান রেখে গেছেন। দিলারা হাশেম ১৯৩৬ সালের ২৬ আগস্ট যশোরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২২ সালের ১৯ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে ইংরেজিতে স্নাতক ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে যোগ দিয়ে ব্রডকাস্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন দিলারা হাশেম। রেডিও পাকিস্তান করাচি থেকে দীর্ঘদিন বাংলা সংবাদ পাঠের পাশাপাশি ঢাকা বেতার ও টেলিভিশনেও সংবাদ পাঠ করেন তিনি। পরে আমেরিকায় গিয়ে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগে কাজ শুরু করেন।
১৯৭৬ সাল থেকে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগে কাজ করেন দিলারা হাশেম। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে পূর্ণকালীন ব্রডকাস্টার হিসেবে যোগ দেন; এর আগে কয়েক বছর খণ্ডকালীন রেডিও ব্রডকাস্টার হিসেবে কাজ করেছিলেন। ২০১১ সালে অবসর নেওয়ার পরও তিনি আমেরিকাতেই বসবাস করেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে বিবিসি লন্ডনেও মাঝে মাঝে বাংলা সংবাদ পাঠ করেছেন।
পেশাগত কাজের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ঘর মন জানালা’ পাঠকমহলে জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৭৩ সালে উপন্যাসটি একই নামে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয় এবং চীনা ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয়।
দিলারা হাশেমের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘একদা এবং অনন্ত’, ‘স্তব্ধতার কানে কানে’, ‘আমলকীর মৌ’, ‘বাদামি বিকেলের গল্প’, ‘কাকতালীয়’, ‘মুরাল’, ‘শঙ্খ করাত’, ‘অনুক্ত পদাবলি’, ‘সদর অন্দর’ ও ‘সেতু’। তাঁর লেখা ‘শেষ রাতের সংলাপ : টুইন টাওয়ার’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র’ও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘হলদে পাখির কান্না’, ‘সিন্ধুপাড়ের কান্না’ ও ‘নায়ক’। একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘ফেরারি’।
১৯৭৮ সালে প্রকাশিত ‘আমলকীর মৌ’ উপন্যাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়কে পটভূমি হিসেবে রাখলেও দিলারা হাশেম সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, উপন্যাসটিতে নারী-স্বাধীনতার প্রশ্ন এবং পুরুষকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় নারী ও পুরুষের সংকট তুলে ধরা হয়েছে।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দিলারা হাশেম বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শঙ্খচিল সাহিত্য পুরস্কার, উত্তর শিকাগো ‘কালচারাল অ্যান্ড লিটারারি ইঙ্ক’ সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত পুরস্কার, মুক্তধারা জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার ও অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
২০১১ সালে ভয়েস অব আমেরিকা থেকে অবসর নেওয়ার সময় এক সাক্ষাৎকারে তিনি অসম্পূর্ণ কাজগুলো নিয়ে নতুন করে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তাঁর সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠান ভয়েস অব আমেরিকার পুরস্কারও পেয়েছে। বিদেশে অবস্থানকালে উপন্যাসে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাঙালি সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়।