
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার নয়; আবার সাংবাদিকের ওপর হামলা কোনোভাবেই মতপার্থক্য নিরসনের গ্রহণযোগ্য পন্থা হতে পারে না। বিশেষ করে কোনো সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ উঠলে ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের পেশাগত নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকারকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
কচুয়ায় সাংবাদিক নাসির উদ্দিন ও তাঁর শিশুকন্যার ওপর হামলার অভিযোগ তাই উদ্বেগজনক। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর নন্দনপুর পশ্চিম বাজার এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি নাসির উদ্দিনের পথরোধ করে লোহার রড দিয়ে হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা শিশুকন্যাও আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগটি সত্য হলে এটি গুরুতর অপরাধ।
গ্রামীণ সাংবাদিকদের কাজের পরিধি বিস্তৃত হলেও নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা অনেক সময় সীমিত থাকে। প্রত্যন্ত উপজেলা বা মফস্বলে তাঁরা স্থানীয় জনজীবনের নানা ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ সংগ্রহ করেন। সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের চাপ, হুমকি কিংবা হামলার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শুধু রাজধানী বা বড় শহরের সংবাদকক্ষের স্বাধীনতা নয়। কোনো উপজেলার অনিয়ম, নির্যাতন, দুর্নীতি, অপরাধ কিংবা জনদুর্ভোগের খবরও জাতীয় জীবনের অংশ। নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্থানীয় সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রকাশ থেকে বিরত থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক জবাবদিহিও সংকুচিত হয়।
কচুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। চাঁদপুরের পুলিশ সুপারও সাংবাদিকের অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। এসব বক্তব্য বাস্তবায়নে অভিযোগ গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই এবং প্রমাণ অনুযায়ী আইনগত পদক্ষেপ জরুরি।
একই সঙ্গে স্পর্শকাতর বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদেরও তথ্য যাচাই, ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা এবং অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপনের নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষার পাশাপাশি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
হামলার সময় সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর শিশুকন্যার উপস্থিতির বিষয়টি ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করেছে। মতবিরোধ বা সংবাদ প্রকাশের বিরোধিতা কোনোভাবেই সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে না।
কচুয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত জরুরি শুধু নাসির উদ্দিনের ন্যায়বিচারের জন্য নয়, গ্রামীণ সাংবাদিকতার নিরাপদ পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেও। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার তদন্তে ভিন্ন বাস্তবতা উঠে এলে সেটিও স্বচ্ছতার সঙ্গে জানাতে হবে। অভিযোগের বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়।
সংবাদ প্রকাশের জবাব সংবাদ, প্রতিবাদ বা আইনি পদক্ষেপ হতে পারে; সহিংসতা নয়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।