
এক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রশংসায় মগ্ন, আরেক গোষ্ঠী পাকিস্তানের গুণগানে ব্যস্ত; অন্যদিকে আরেক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও লুটপাটে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—ঘটনা কী?
ইদানীং জিন্নাহকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু আর্কাইভে তাঁর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ, ছবি ছেঁড়া এবং পাল্টা কর্মসূচির ঘটনা ইতিহাসকে বোঝার বদলে রাজনৈতিক বিরোধে ব্যবহারের প্রশ্ন সামনে এনেছে। জিন্নাহ বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ, পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাঁকে নিয়ে ইতিহাসচর্চা হতে পারে; তবে ইতিহাসকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো ভিন্ন বিষয়।
দেশে যখন দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন, তখন ইতিহাসের বিতর্কে রাষ্ট্র ও সমাজের শক্তি কতটা ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।
এদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে তদন্ত, সম্পদ জব্দ, অর্থ পাচারের অভিযোগ ও মামলা চলছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট জানিয়েছে, ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ বা জব্দ করা হয়েছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির এক প্রতিবেদনে ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাণিজ্য-সংক্রান্ত ভুল ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহের হিসাবের কথা বলা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর জরিপে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে মানুষের দেওয়া ঘুষের পরিমাণ ১২,৬৩৩ কোটি টাকার বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জরিপে ৮১.৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নিয়োগ-বদলি-পদায়ন, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ঘুষ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগের মোট আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বলা হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, অভিযোগ যাচাই করে দেখা হবে এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো বিষয়কে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বলা যাবে না। আসিফ মাহমুদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
এই ঘটনায় ব্যক্তি আসিফ মাহমুদের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—এত বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন, সম্পদ অর্জন বা বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ উঠতে পারল কীভাবে। রাষ্ট্রের আর্থিক নজরদারি ব্যবস্থা, ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, কর প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, বিমানবন্দর ও সীমান্ত নজরদারি—এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহি প্রয়োজন।
অর্থ পাচার কোনো এক দিনে ঘটে না। ব্যাংকিং লেনদেন, কোম্পানি, সম্পত্তি, আমদানি-রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর নথি ও অন্যান্য আর্থিক রেকর্ডে এর চিহ্ন থাকার কথা। তাই শুধু ‘তদন্ত চলছে’ বললে জনগণের প্রশ্নের উত্তর হয় না; জানতে হবে কে দেখছিল, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েনি কেন।
অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদের তদন্ত রাজনৈতিক পরিচয়-নিরপেক্ষ হওয়া, চাঁদাবাজি ও ঘুষের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক হতে পারে, তবে ইতিহাসের নামে উসকানি বা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার।
বাংলাদেশ কোনো বিদেশি শক্তির অনুসারী হওয়ার জন্য স্বাধীন হয়নি; দেশটি স্বাধীন হয়েছে নিজের মানুষ, রাষ্ট্র ও ভবিষ্যতের জন্য। তাই জিন্নাহর ছবি রাখা বা ছেঁড়ার বিতর্কের পাশাপাশি দেশের টাকা কোথায় যাচ্ছে, জনগণের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, সাধারণ মানুষ ঘুষ ছাড়া কতটা সেবা পাচ্ছে এবং দুর্নীতির অভিযোগের শেষ পরিণতি কী—এসব প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দেশকে বিভক্ত করে, ইতিহাসকে রাজনৈতিক সংঘাতের উপকরণ বানিয়ে এবং দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করে কোনো দেশ টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি জরুরি জাতীয় সতর্কসংকেত।