
শিশু জগতের সরল প্রাণ ও কোমলমতি সত্তার আড়ালে থাকা জটিল মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে শিশুর মতো হতে হয়। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ শিশুকে চিরপুরাতন, তবু চিরনূতন বলেছেন। জগতের বড় লেখকদের মতো কবি কাজী নজরুলও ছিলেন একজন বড় শিশু। নিজের শৈশব পেরিয়ে শিশুপুত্রদের মাধ্যমে তিনি শিশুদের আচরণ, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া-পাওয়া খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাই কাজী নজরুলকে শিশুর গোপন রাজ্যের অভিযাত্রী বলা যায়।
শৈশবে নজরুল ছিলেন দুরন্ত ও ডানপিটে। গাছের ফল পেড়ে খাওয়া, গাছে উঠে পাখির বাসা থেকে ডিম নেওয়া, পুকুরে দীর্ঘ সময় ডুবে থাকা কিংবা গুলতি দিয়ে পাখি শিকার—এসব দুষ্টুমিতে তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। তাঁর হাসি ও দুরন্তপনায় কাজী নজরুল যেন চিরকিশোর হয়ে থাকেন।
মূলত বড়দের কবি হলেও বন্ধু কাজী হাবীবুল্লাহ বাহারের অনুরোধে নজরুল শিশু সাহিত্য রচনায় মন দেন। তাঁর শিশু সাহিত্যে কবিতা ও ছড়ার প্রাধান্য থাকলেও শিশুতোষ গানের বাণীও রয়েছে। শামসুন্নাহার মাহমুদের সন্তান, আশালতা সেনগুপ্ত ও তাঁর ছোট কাকাতো বোন এবং নিজের শিশুপুত্রদের কথা মাথায় রেখেও তিনি এসব রচনা করেন।
সিয়ার সোল রাজস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় কড়িকাঠের চড়ুই পাখির বাসা থেকে পড়ে যাওয়া একটি ছানাকে নজরুল মই দিয়ে তুলে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন। পরে এই ঘটনা অবলম্বনে তিনি ‘চড়ুই পাখির ছানা’ কবিতা লেখেন। এতে তাঁর জীবপ্রেমের প্রকাশ ঘটে।
নজরুলের ছোট দুই পুত্র কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধের ডাকনাম ছিল সানি ও নিনি। মানিকগঞ্জের তেওতা জমিদারবাড়িতে তাঁদের দুরন্তপনা দেখে নজরুল ‘ছোট হিটলার’ কবিতা রচনা করেন। শিশুদের অনুসন্ধিৎসা, দৃঢ় মনোবল, মানবিকতা ও দেশাত্মবোধ জাগাতেও তাঁর লেখায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শিশুদের জন্য গান রচনায় নজরুল প্রকৃতি, মরুভূমি, মমি, নদী, ঘূর্ণি ও দেশের সৌন্দর্যকে জীবন্ত করে তুলেছেন। ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু বঙ্গ জননী’ গানের মতো রচনায় শিশুদের মনে দেশপ্রেম জাগানোর প্রয়াস দেখা যায়।
নজরুলের শিশুতোষ বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ঝিঙে ফুল’, ‘পুতুল বিয়ে’, ‘ফুলে ও ফসলে’, ‘তরুণের অভিযান’, ‘সাতভাই চম্পা’, ‘মটকু মাইতি’, ‘জাগো সুন্দর চির কিশোর’ ও ‘সঞ্চায়ন’। তাঁর কিশোর ও শিশুতোষ কবিতায় দুরন্তপনা, রহস্য অনুসন্ধান, ঘুম, দাদুর সঙ্গে খুনসুটি, কাঠবেরালির দৌরাত্ম্য এবং শিশুমনের নানা আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছে।
শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝার অসাধারণ ক্ষমতায় নজরুল খোকার বোকামি, কৌতুক, গল্প বলার ভঙ্গি, চিঠি লেখা, ঘুমপাড়ানি গান, ডাকনাম ধরে ক্ষেপানো এবং কৈশোরের দুষ্টুমিকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। ‘লিচুচোর’ কবিতায় তিনি কৈশোরের ডানপিটে স্বভাব ও ফল চুরি করতে গিয়ে কুকুরের তাড়া খাওয়ার চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর সাহিত্যচর্চায় শিশু ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও শক্তির আধার হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।