
নিজস্ব প্রতিনিধি: ডা. আবুল কালাম আজাদ বাবার স্বপ্ন পূরণে চিকিৎসক হয়েছেন। ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৫নং পূর্ব গুপ্টি ইউনিয়নের দত্রা গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই চিকিৎসক স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। সরকারি চাকরির চেষ্টা না করে মা-বাবার পাশে থাকা এবং নিজ এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবায় আত্মনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেন তিনি। ২০০১ সাল থেকে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ডা. আজাদ বর্তমানে বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশন হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি এবং ফরিদগঞ্জ উপজেলার গল্লাক আদর্শ কলেজের সভাপতি। হাজীগঞ্জের বেসরকারি চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসাব্যয়, রোগীর আস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন।
ডা. আবুল কালাম আজাদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফরিদগঞ্জের দত্রা গ্রামে। গুপ্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হুগলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি খাজুরিয়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে এসএসসি এবং ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন।
তাঁর ভাষ্য, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নটি মূলত তাঁর বাবার ছিল। মা-বাবার দোয়া, বাবার ইচ্ছা ও নিজের চেষ্টায় তিনি মেডিকেলে ভর্তি হতে সক্ষম হন। ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক কারণে প্রায় তিন বছর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারলেও পরে পড়াশোনা শেষ করেন।
২০০০ সালে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর ২০০১ সালে রামগঞ্জ এলাকায় চিকিৎসাসেবা শুরু করেন তিনি। ইন্টার্নশিপে গাইনি বিভাগে প্রথম পোস্টিংয়ের সময় একটি জটিল প্রসবের অভিজ্ঞতা তাঁকে চিকিৎসা পেশায় দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতার গুরুত্ব উপলব্ধি করায়। ২০০৯ সালে প্রশিক্ষণের পর অস্ত্রোপচার শুরু করেন এবং বিভিন্ন জটিল রোগীর চিকিৎসা করেছেন বলে জানান।
সরকারি চাকরিতে না গিয়ে নিজ এলাকায় চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে মা-বাবার পাশে থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁদের জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত পাশে থাকতে পারা এবং চিকিৎসা করতে পারাকে জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন ডা. আজাদ।
বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশন হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি হিসেবে তাঁর লক্ষ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মানসম্মত, স্বচ্ছ ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করা। রোগীকে ব্যবসার মাধ্যম না দেখে সেবার কেন্দ্রে রাখার কথা বলেছেন তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি ও অন্যান্য খরচের তালিকা দৃশ্যমান স্থানে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসার চেয়ে ব্যবসায় বেশি গুরুত্ব দেয়—এমন অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন ডা. আজাদ। তাঁর মতে, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অস্পষ্ট বিল বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ থেকে রোগীর মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। রোগীকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো, অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়ানো এবং বিলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
ডা. আজাদের ভাষ্য, প্রাথমিক চিকিৎসায় হাজীগঞ্জের অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও সব ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সার্বক্ষণিক পাওয়া যায় না। উপজেলায় মেডিকেল কলেজ না থাকায় জটিল রোগের চিকিৎসায় কখনো অন্যত্র যেতে হয়। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্ত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির পক্ষে মত দেন।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাজীগঞ্জে প্রায় ৩৮টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। তবে শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে সেবার মান বিচার করা যায় না। দক্ষ চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা ও রোগীর সঙ্গে ভালো আচরণ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি বাড়লে রোগীদের চাঁদপুর শহর বা ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ভবিষ্যতে ন্যূনতম সেবামান, জবাবদিহি, প্রকাশ্য ফি-তালিকা, মানবিক আচরণ এবং প্রয়োজন হলে রোগীকে যথাসময়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চান ডা. আবুল কালাম আজাদ। তাঁর মতে, সংগঠনের কাজ শুধু মালিকদের স্বার্থ দেখা নয়; রোগীর স্বার্থ ও জনস্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া।